রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬ | ২৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সত্যের দাবি, সবার আগে

ব্রেকিং
প্যারাগুয়ে ব্যাংক ধস: প্রেসিডেন্ট পেনিয়া অপসারিত, এখন গৃহবন্দী এলপিজির দাম নভেম্বর ২০২৬: ১২ কেজি ২,০৬০ টাকা, বাজারে কেন আরও বেশি গ্রাম পুলিশের বেতন বাড়ল: সদস্য সাড়ে ১০ হাজার, প্রধান ১১ হাজার টাকা ঢাকার বায়ুদূষণ: একিউআই ১৯৬, বিশ্বে চতুর্থ; সুরক্ষায় যা করবেন চিপ শেয়ারে ধস: এক দিনে এনভিডিয়ার ৪৫০ বিলিয়ন ডলার উধাও, কারণ কী ঢাবি ভর্তি ২০২৬-২৭: আবেদন শুরু ১১ নভেম্বর, ফি ও যোগ্যতা এক নজরে দ্য উইকেন্ডের ট্যুর রেকর্ড: ১৩০ কোটি ডলার, পুরুষ শিল্পীদের শীর্ষে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ ২০২৬: ইব্রাহিমের গোলে জয়, সেমির সমীকরণে বাংলাদেশ হোয়াইট হাউসের নতুন চিফ অব স্টাফ স্টিফেন মিলার, সরলেন সুসি ওয়াইলস রিজার্ভ ৩০ বিলিয়ন ডলারের নিচে: আকুর ১৬৪ কোটি ডলার শোধের পর কী দাঁড়াল

প্যারাগুয়ে ব্যাংক ধস: প্রেসিডেন্ট পেনিয়া অপসারিত, এখন গৃহবন্দী

উয়েনো ব্যাংক ধসে প্যারাগুয়ের প্রেসিডেন্ট অপসারিত ও গৃহবন্দী। নতুন প্রেসিডেন্ট পেদ্রো আলিয়ানা শপথ নিয়েছেন। ৩০ লাখ গ্রাহকের কী হবে, বিস্তারিত জানুন।

প্যারাগুয়ের রাজধানী আসুনসিওনে প্রেসিডেন্টের কার্যালয় লোপেজ প্যালেস
আসুনসিওনের লোপেজ প্যালেস, প্যারাগুয়ের প্রেসিডেন্টের কার্যালয় (প্রতীকী ছবি)। ছবি: Jan Pešula / Wikimedia Commons (CC BY-SA 2.5)

দক্ষিণ আমেরিকার দেশ প্যারাগুয়েতে একটি ডিজিটাল ব্যাংকের ধস এক সপ্তাহের মধ্যেই দেশটির প্রেসিডেন্টের পতন ঘটিয়েছে। শুক্রবার (৬ নভেম্বর ২০২৬) সিনেটে অভিশংসন বিচারে প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো পেনিয়াকে পদ থেকে অপসারণ করা হয় এবং প্রায় এক ঘণ্টার মধ্যে ভাইস প্রেসিডেন্ট পেদ্রো আলিয়ানা দেশের নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন। একই দিনে প্রসিকিউটররা পেনিয়াকে গৃহবন্দী রাখার নির্দেশ দেন। শনিবার (৭ নভেম্বর) সকালে তিনি প্রসিকিউটরদের মুখোমুখি হন। পুরো সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে উয়েনো ব্যাংক (ueno), যার প্রায় ৩০ লাখ গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট হঠাৎ অচল হয়ে পড়েছে।

প্যারাগুয়ে ব্যাংক ধস: কী ঘটেছে উয়েনো ব্যাংকে

মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) প্যারাগুয়ের কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, উয়েনো ব্যাংকের মূলধন আইনি ন্যূনতম সীমার নিচে নেমে গেছে। এরপর ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ইউরোনিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরিদর্শকেরা দেখতে পান যথাযথ কাগজপত্র ছাড়া ঋণ দেওয়া হয়েছে এবং কিছু খরচকে সম্পদ হিসেবে দেখানো হয়েছে। হিসাব সংশোধনের পর ব্যাংকের মূলধন আইনি সীমার অর্ধেকে নেমে আসে।

নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পরপরই ব্যাংকটির অ্যাপ, কার্ড ও টাকা পাঠানোর সেবা বন্ধ হয়ে যায়, শাখাগুলোও বন্ধ থাকে। অনেক অবসরভোগী রাষ্ট্রীয় ভাতা পেতেন এই ব্যাংকের মাধ্যমেই, তাঁরাও টাকা তুলতে পারছেন না। আতঙ্কে মানুষ অন্য ব্যাংকে হিসাব খুলতে ছুটলে সেসব ব্যাংকের অ্যাপেও বিভ্রাট দেখা দেয়।

পটভূমি: দ্রুত বেড়ে ওঠা এক ডিজিটাল ব্যাংক

উয়েনো ২০২৩ সালে ব্যাংকিং লাইসেন্স পায়। এর আগে এটি কয়েক দশকের পুরোনো একটি ফাইন্যান্স কোম্পানি ছিল, যা নতুন নামে ডিজিটাল ব্যাংক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি ছিল, দেশে ১০ লাখের বেশি মানুষ জীবনের প্রথম ব্যাংক হিসাব খুলেছেন উয়েনোতেই। ফলে যাঁরা আগে ব্যাংকিং সেবার বাইরে ছিলেন, ধসের ধাক্কা সবচেয়ে বেশি লেগেছে তাঁদের গায়েই।

বিতর্কের মূল জায়গা হলো ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে ব্যাংকটির সম্পর্ক। প্রেসিডেন্ট পেনিয়া গত বছর পর্যন্ত উয়েনোর হোল্ডিং কোম্পানির শেয়ারধারী ছিলেন। তিনি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান পদে বসিয়েছিলেন কার্লোস কারবাইয়োকে, যিনি একসময় উয়েনোর পূর্বসূরি প্রতিষ্ঠানের প্রধান ছিলেন। অর্থাৎ যে ব্যাংক তদারকির দায়িত্ব কেন্দ্রীয় ব্যাংকের, তার সঙ্গেই নিয়ন্ত্রকের পুরোনো সম্পর্ক ছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংক অবশ্য স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, কারবাইয়ো উয়েনো-সংক্রান্ত সব সিদ্ধান্ত থেকে নিজেকে সরিয়ে রেখেছিলেন। এই সপ্তাহে তিনি পদত্যাগ করেন এবং শুক্রবার তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়।

তথ্য-উপাত্তে সংকট

বিষয়তথ্য
উয়েনোর গ্রাহকপ্রায় ৩০ লাখ, দেশের প্রাপ্তবয়স্কদের অর্ধেকের বেশি
সরকারি উৎসের আমানতপ্রায় ৮০ কোটি মার্কিন ডলার
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ৩ নভেম্বর (মঙ্গলবার)
পেনিয়ার পদত্যাগের ঘোষণা ও নিম্নকক্ষে অভিশংসন৫ নভেম্বর (বৃহস্পতিবার)
সিনেটে অপসারণ, আলিয়ানার শপথ, পেনিয়া গৃহবন্দী৬ নভেম্বর (শুক্রবার)
প্রসিকিউটরদের সামনে পেনিয়ার হাজিরা৭ নভেম্বর (শনিবার)
নতুন প্রেসিডেন্টের মেয়াদ২০২৮ সালের আগস্ট পর্যন্ত

পদত্যাগ করেও কেন অভিশংসন

বৃহস্পতিবার সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া ভিডিও বার্তায় পেনিয়া পদত্যাগের ঘোষণা দেন এবং দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চান। তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান রক্ষা ও সামাজিক শান্তির জন্য তিনি সরে দাঁড়াচ্ছেন। কিন্তু কংগ্রেস সেই পদত্যাগ গ্রহণ না করে অভিশংসন প্রক্রিয়া চালিয়ে যায়। আল জাজিরার প্রতিবেদন বলছে, পদত্যাগ গৃহীত হলে তিনি সাবেক প্রেসিডেন্ট হিসেবে সিনেটের আসন ও বিচার থেকে আইনি সুরক্ষা পেতেন। আইনপ্রণেতারা সেই পথ বন্ধ করে দেন।

অভিশংসনের অভিযোগের মধ্যে রয়েছে স্বার্থের সংঘাত, নিয়ন্ত্রক তদারকিতে হস্তক্ষেপ, পেনশন তহবিলের অর্থ সরিয়ে নেওয়া এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জড়িয়ে তথ্য গোপনে অংশ নেওয়া। সিনেট তাঁকে দায়িত্ব পালনে অসদাচরণের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে। প্রসিকিউটররা বিশ্বাসভঙ্গসহ কয়েকটি অপরাধের সন্দেহে তাঁকে গৃহবন্দী রাখার আদেশ দেন। পেনিয়া সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং তদন্তে সহযোগিতার কথা বলেছেন। তাঁর ভাষায়, বিষয়টি মূলত নিয়ন্ত্রণ-সংক্রান্ত সমস্যা। ২০১২ সালে ফের্নান্দো লুগোর পর এই প্রথম প্যারাগুয়েতে কোনো প্রেসিডেন্টকে অভিশংসনে সরানো হলো।

নতুন প্রেসিডেন্ট আলিয়ানা ও সামনের চ্যালেঞ্জ

৫২ বছর বয়সী রক্ষণশীল রাজনীতিক পেদ্রো আলিয়ানা ২০২৩ সাল থেকে পেনিয়ার ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তিনি নিজ অঞ্চল নিয়েম্বুকুর গভর্নর ছিলেন এবং প্রায় এক দশক নিম্নকক্ষের সদস্য ছিলেন। শপথের পর তিনি ক্ষতিগ্রস্ত আমানতকারীদের ক্ষতিপূরণের উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেছেন, তবে বিস্তারিত জানাননি। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বেশির ভাগ আমানত ফেরতের নিশ্চয়তা দিয়েছে এবং কিছু গ্রাহক বৃহস্পতিবার থেকে টাকা ফেরত পেতে শুরু করেছেন।

তবে রাস্তায় ক্ষোভ এখনো কমেনি। রাজধানী আসুনসিওনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সামনে বিক্ষোভকারীরা “আমাদের টাকা ফেরত চাই” স্লোগান দিয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, অর্থ ফেরত দিতে দেরি হলে বা দায়ীরা পার পেয়ে যাচ্ছেন বলে মনে হলে বিক্ষোভ আরও বাড়তে পারে। পেনিয়া ছিলেন দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা কলোরাডো পার্টির নেতা এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত। ফলে এই পতন লাতিন আমেরিকার রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।

প্রশ্নোত্তর: বাংলাদেশি পাঠকের জন্য শিক্ষা কী

প্রশ্ন: একটি ব্যাংকের ধসে প্রেসিডেন্টের পতন হলো কেন?
উত্তর: কারণ ব্যাংকটির গ্রাহক ছিলেন দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ, সরকারি তহবিলও সেখানে রাখা ছিল, আর প্রেসিডেন্ট নিজে এর মালিকানার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগ ওঠে।

প্রশ্ন: গ্রাহক হিসেবে কী শেখার আছে?
উত্তর: সব সঞ্চয় একটি প্রতিষ্ঠানে না রাখা, প্রতিষ্ঠানটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লাইসেন্সপ্রাপ্ত কি না যাচাই করা এবং আমানত বিমার সীমা জেনে রাখা জরুরি। ডিজিটাল সেবা যত সহজই হোক, প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বাস্থ্য ও তদারকি সমান গুরুত্বপূর্ণ।

প্রশ্ন: নিয়ন্ত্রকের জন্য বার্তা কী?
উত্তর: তদারকি সংস্থার প্রধান ও তদারক করা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পুরোনো সম্পর্ক থাকলে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। উয়েনোর ঘটনা দেখাচ্ছে, দুর্বল তদারকির খেসারত শেষ পর্যন্ত সাধারণ আমানতকারী ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকেই দিতে হয়।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা, এনপিআর, ইউরোনিউজ, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ব্লুমবার্গ

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। মন্তব্য প্রকাশের আগে মন্তব্য নীতিমালা পড়ুন।