হাম পরিস্থিতি: ২৪ ঘণ্টায় উপসর্গে ৪ মৃত্যু, ৮ মাসে মোট মৃত্যু ১২৭৬
হামের উপসর্গে ২৪ ঘণ্টায় আরও ৪ জনের মৃত্যু, সবাই ঢাকায়। ১৫ মার্চ থেকে মোট মৃত্যু ১২৭৬, সন্দেহভাজন রোগী ২ লাখ ৩৬ হাজার ছাড়িয়েছে। বিস্তারিত ও করণীয়।
দেশে হামের প্রকোপ থামছে না। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের শুক্রবারের (৬ নভেম্বর ২০২৬) বুলেটিন অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। মৃতদের সবাই ঢাকা বিভাগে চিকিৎসাধীন ছিলেন। একই সময়ে নতুন করে ১ হাজার ২৩৯ জন সন্দেহভাজন এবং ৭৫ জন নিশ্চিত হামের রোগী শনাক্ত হয়েছেন—সব মিলিয়ে ১ হাজার ৩১৪ জন। এ নিয়ে ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত মোট মৃত্যু দাঁড়াল ১ হাজার ২৭৬ জনে।
প্রাদুর্ভাবের পটভূমি
চলতি বছরের মার্চের মাঝামাঝি থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর হামের আলাদা হিসাব রাখতে শুরু করে। এরপর প্রায় আট মাস ধরে প্রতিদিনই নতুন রোগী ও মৃত্যুর খবর আসছে। শুরুতে ঢাকা ও সিলেট অঞ্চলে সংক্রমণ বেশি দেখা গেলেও ধীরে ধীরে আটটি বিভাগেই রোগী ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার দেশজুড়ে হাম-রুবেলা টিকার বিশেষ ক্যাম্পেইন চালায়, তবু সংক্রমণের ধারা পুরোপুরি থামেনি।
তুলনা করলে চিত্রটা স্পষ্ট হয়। ১৪ সেপ্টেম্বরের বুলেটিনে মোট মৃত্যু ছিল ১ হাজার ৩০ জন, সন্দেহভাজন রোগী ছিলেন ১ লাখ ৭২ হাজার ৭২০ জন। অর্থাৎ পরের ৫৩ দিনে আরও ২৪৬ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং সন্দেহভাজন রোগী বেড়েছে প্রায় ৬৪ হাজার। গড়ে দিনে চার থেকে পাঁচজনের মৃত্যু—যা এখনো উদ্বেগজনক।
তথ্য-উপাত্তে হাম পরিস্থিতি
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ বুলেটিনের মূল সংখ্যাগুলো নিচের টেবিলে তুলে ধরা হলো:
| বিষয় | গত ২৪ ঘণ্টা | ১৫ মার্চ থেকে মোট |
|---|---|---|
| সন্দেহভাজন রোগী | ১,২৩৯ | ২,৩৬,৭১৪ |
| নিশ্চিত রোগী | ৭৫ | ২৪,২৯৪ |
| উপসর্গে মৃত্যু | ৪ | ১,১৭১ |
| নিশ্চিত হামে মৃত্যু | ০ | ১০৫ |
| মোট মৃত্যু | ৪ | ১,২৭৬ |
| হাসপাতালে ভর্তি (সন্দেহভাজন) | — | ২,১০,৯৮২ |
| সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র | — | ২,০২,৩৯৪ |
বিভাগভিত্তিক হিসাবে উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর প্রায় ৪৫ শতাংশই ঢাকা বিভাগে—৫২৬ জন। এরপর সিলেটে ২০৪, চট্টগ্রামে ১১৪, রাজশাহীতে ৯৩, ময়মনসিংহে ৮৯, বরিশালে ৭০, খুলনায় ৫৭ এবং রংপুরে ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে।
বিশ্লেষণ: সংখ্যার ভেতরের বার্তা
ইতিবাচক দিক হলো, হাসপাতালে ভর্তি সন্দেহভাজন রোগীদের প্রায় ৯৬ শতাংশ সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। মোট সন্দেহভাজন রোগীর তুলনায় মৃত্যুহার আধা শতাংশের কিছু বেশি। তবে দৈনিক হাজারের বেশি নতুন রোগী শনাক্ত হওয়া বলছে, সংক্রমণ এখনো সক্রিয়ভাবে ছড়াচ্ছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সাধারণত বলেন, হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ; একটি এলাকায় টিকার আওতার বাইরে থাকা শিশুর সংখ্যা বেশি হলে সেখানে দ্রুত সংক্রমণ ছড়ায়। ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে মৃত্যু ও রোগীর সংখ্যা বেশি হওয়ার পেছনে এই ঘনত্ব এবং বড় হাসপাতালগুলোতে গুরুতর রোগী স্থানান্তরের বিষয়টিও ভূমিকা রাখতে পারে। সামনে শীত মৌসুম; এ সময় শ্বাসতন্ত্রের অন্যান্য সংক্রমণ বেড়ে গেলে হামের জটিলতা, বিশেষ করে নিউমোনিয়ার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
অভিভাবকদের জন্য করণীয়
- টিকার কার্ড দেখুন: সরকারি সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচিতে (ইপিআই) শিশুকে ৯ মাস ও ১৫ মাস বয়সে দুই ডোজ হাম-রুবেলা টিকা দেওয়া হয়। কোনো ডোজ বাদ পড়লে নিকটস্থ টিকাকেন্দ্রে যোগাযোগ করুন।
- উপসর্গ চিনুন: জ্বর, সর্দি-কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং কয়েক দিন পর মুখ থেকে শরীরে ছড়ানো লালচে ফুসকুড়ি হামের সাধারণ লক্ষণ।
- দেরি নয়: শ্বাসকষ্ট, খিঁচুনি, পানিশূন্যতা বা শিশু নিস্তেজ হয়ে পড়লে দ্রুত হাসপাতালে নিন।
- আলাদা রাখুন: আক্রান্ত শিশুকে স্কুল ও জনসমাগম থেকে দূরে রাখুন, যাতে অন্যরা সংক্রমিত না হয়।
- পুষ্টি ও ভিটামিন এ: চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ভিটামিন এ এবং পর্যাপ্ত তরল খাবার দিন।
প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন: উপসর্গে মৃত্যু আর নিশ্চিত মৃত্যুর পার্থক্য কী?
উত্তর: যাঁদের শরীরে হামের লক্ষণ ছিল কিন্তু পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হওয়া যায়নি, তাঁদের মৃত্যু ‘উপসর্গে মৃত্যু’ হিসেবে গণ্য হয়। পরীক্ষায় হাম শনাক্ত হলে তা নিশ্চিত মৃত্যু।
প্রশ্ন: আগে টিকা নেওয়া শিশুরও কি হাম হতে পারে?
উত্তর: দুই ডোজ টিকা হামের বিরুদ্ধে উচ্চমাত্রার সুরক্ষা দেয়; বিরল ক্ষেত্রে সংক্রমণ হলেও তা সাধারণত মৃদু হয়। তাই টিকা সম্পূর্ণ করাই সবচেয়ে কার্যকর সুরক্ষা।
প্রশ্ন: বড়রাও কি হামে আক্রান্ত হতে পারেন?
উত্তর: হ্যাঁ। যাঁরা ছোটবেলায় টিকা পাননি বা আগে কখনো হামে আক্রান্ত হননি, তাঁরাও সংক্রমিত হতে পারেন। গর্ভবতী নারী ও দীর্ঘমেয়াদি রোগে ভোগা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে জটিলতার ঝুঁকি বেশি, তাই উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
প্রশ্ন: হামের তথ্য কোথায় পাওয়া যাবে?
উত্তর: স্বাস্থ্য অধিদপ্তর প্রতিদিন হাম পরিস্থিতির বুলেটিন প্রকাশ করছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্য বাতায়নের ১৬২৬৩ নম্বরে ফোন করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া যায়। গুজবে কান না দিয়ে সরকারি তথ্যের ওপর ভরসা রাখাই নিরাপদ।
সব মিলিয়ে, সুস্থতার হার বেশি হলেও প্রতিদিনের মৃত্যু ও নতুন রোগীর সংখ্যা মনে করিয়ে দিচ্ছে—প্রাদুর্ভাব এখনো শেষ হয়নি। টিকার আওতা বাড়ানো, দ্রুত রোগ শনাক্ত এবং সময়মতো চিকিৎসাই এই মুহূর্তে মৃত্যু কমানোর প্রধান উপায়।
তথ্যসূত্র: স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাম বিষয়ক দৈনিক বুলেটিন, আজকের পত্রিকা, নাগরিক, ঢাকা ট্রিবিউন।



মন্তব্য (০)