ঢাকার বায়ুদূষণ: একিউআই ১৯৬, বিশ্বে চতুর্থ; সুরক্ষায় যা করবেন
ছুটির দিনেও অস্বাস্থ্যকর ঢাকার বাতাস, একিউআই ১৯৬ নিয়ে দূষণে বিশ্বে চতুর্থ। একিউআই মানে কী, স্বাস্থ্যঝুঁকি কতটা আর দূষিত দিনে কীভাবে সুরক্ষিত থাকবেন জেনে নিন।

ঢাকা, ৭ নভেম্বর ২০২৬: সাপ্তাহিক ও সাধারণ ছুটির দিনেও স্বস্তি মেলেনি রাজধানীর বাতাসে। শনিবার সকাল পৌনে ৯টা থেকে ৯টার দিকে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বায়ুমান পর্যবেক্ষণ প্রতিষ্ঠান আইকিউএয়ারের তালিকায় ঢাকার বায়ুমান সূচক (একিউআই) ছিল ১৯৬, যা ‘অস্বাস্থ্যকর’ শ্রেণির। বিশ্বের বড় শহরগুলোর মধ্যে দূষণে ঢাকা ছিল চতুর্থ স্থানে। একই সময়ে ৫২৯ স্কোর নিয়ে শীর্ষে ছিল ভারতের রাজধানী দিল্লি। ঢাকার স্কোর ‘খুবই অস্বাস্থ্যকর’ শ্রেণির সীমা (২০১) থেকে মাত্র পাঁচ পয়েন্ট নিচে, অর্থাৎ শিশু-বয়স্ক তো বটেই, সুস্থ মানুষের জন্যও এই বাতাস ঝুঁকিপূর্ণ।
আজ সকালের চিত্র: দূষণের শীর্ষ ১০ শহর
শীত নামার শুরুতেই দক্ষিণ এশিয়ার শহরগুলোতে দূষণ বাড়তে শুরু করেছে, আজকের তালিকাতেও সেই প্রবণতা স্পষ্ট। প্রথম পাঁচটি শহরের সবকটিই দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার।
| অবস্থান | শহর (দেশ) | একিউআই | শ্রেণি |
|---|---|---|---|
| ১ | দিল্লি (ভারত) | ৫২৯ | ঝুঁকিপূর্ণ |
| ২ | লাহোর (পাকিস্তান) | ২৭৫ | খুবই অস্বাস্থ্যকর |
| ৩ | কলকাতা (ভারত) | ২৩৬ | খুবই অস্বাস্থ্যকর |
| ৪ | ঢাকা (বাংলাদেশ) | ১৯৬ | অস্বাস্থ্যকর |
| ৫ | কাবুল (আফগানিস্তান) | ১৬৮ | অস্বাস্থ্যকর |
| ৬ | বার্মিংহাম (যুক্তরাজ্য) | ১৬০ | অস্বাস্থ্যকর |
| ৭ | করাচি (পাকিস্তান) | ১৫৭ | অস্বাস্থ্যকর |
| ৮ | রটারডাম (নেদারল্যান্ডস) | ১৫৩ | অস্বাস্থ্যকর |
| ৯ | চেংদু (চীন) | ১৫২ | অস্বাস্থ্যকর |
| ১০ | হো চি মিন সিটি (ভিয়েতনাম) | ১৫১ | অস্বাস্থ্যকর |
একিউআই একটি তাৎক্ষণিক সূচক; দিনের বিভিন্ন সময়ে বাতাসের গতি, তাপমাত্রা ও যানবাহনের চাপ অনুযায়ী এটি ওঠানামা করে। সাধারণত ভোর ও সন্ধ্যার পর বাতাস স্থির থাকায় দূষিত কণা মাটির কাছাকাছি জমে থাকে এবং সূচক বেশি দেখায়।
একিউআই স্কোর কী বোঝায়
আইকিউএয়ার যে মার্কিন মানদণ্ডের একিউআই ব্যবহার করে, তা মূলত বাতাসে ভাসমান অতিক্ষুদ্র বস্তুকণা (পিএম২.৫), পিএম১০, ওজোন, নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইডসহ কয়েকটি দূষকের মাত্রা থেকে হিসাব করা হয়। ঢাকার মতো শহরে সূচক বাড়ার প্রধান কারণ পিএম২.৫, যা চুলের চেয়ে প্রায় ৩০ গুণ সরু এবং শ্বাসের সঙ্গে ফুসফুস পেরিয়ে রক্তপ্রবাহে পৌঁছাতে পারে।
| একিউআই স্কোর | শ্রেণি | যাদের জন্য ঝুঁকি |
|---|---|---|
| ০–৫০ | ভালো | ঝুঁকি নেই বললেই চলে |
| ৫১–১০০ | মাঝারি | অতিসংবেদনশীল কিছু মানুষ |
| ১০১–১৫০ | সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য অস্বাস্থ্যকর | শিশু, বয়স্ক, হাঁপানি ও হৃদ্রোগী |
| ১৫১–২০০ | অস্বাস্থ্যকর | সবার; সংবেদনশীলদের বেশি |
| ২০১–৩০০ | খুবই অস্বাস্থ্যকর | সবার জন্য গুরুতর |
| ৩০১+ | ঝুঁকিপূর্ণ | জরুরি স্বাস্থ্য সতর্কতা |
পটভূমি: শীত এলেই কেন দূষণ বাড়ে
বর্ষায় বৃষ্টি বাতাসের ধুলা-ধোঁয়া অনেকটা ধুয়ে নেয়। কিন্তু নভেম্বর থেকে বৃষ্টি কমে যায়, বাতাসের গতিও কমে। শীতের সকালে ভূপৃষ্ঠের কাছের ঠান্ডা বাতাসের ওপর উষ্ণ বাতাসের একটি স্তর ঢাকনার মতো বসে থাকে, ফলে দূষিত কণা ওপরে উঠে ছড়াতে পারে না। এর সঙ্গে যোগ হয় শুষ্ক মৌসুমে বাড়তে থাকা নির্মাণকাজের ধুলা, ইটভাটার ধোঁয়া, পুরোনো যানবাহনের কালো ধোঁয়া, খোলা জায়গায় বর্জ্য পোড়ানো এবং সীমান্তের ওপার থেকে আসা দূষিত বাতাস। আজ দিল্লি, লাহোর ও কলকাতার উচ্চ সূচকও ইঙ্গিত দেয়, পুরো অঞ্চলেই মৌসুমি দূষণ শুরু হয়ে গেছে।
স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব: দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি বড়
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ২০২১ সালের নির্দেশিকা অনুযায়ী, পিএম২.৫-এর বার্ষিক গড় মাত্রা প্রতি ঘনমিটারে ৫ মাইক্রোগ্রাম এবং ২৪ ঘণ্টার গড় ১৫ মাইক্রোগ্রামের মধ্যে থাকা উচিত। সংস্থাটির হিসাবে বায়ুদূষণে বিশ্বে বছরে প্রায় ৭০ লাখ মানুষের অকালমৃত্যু হয়। বাংলাদেশের জাতীয় মানদণ্ডে পিএম২.৫-এর বার্ষিক সীমা ৩৫ মাইক্রোগ্রাম, অথচ শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের এনার্জি পলিসি ইনস্টিটিউটের (ইপিক) ‘এয়ার কোয়ালিটি লাইফ ইনডেক্স’-এর ২০২৫ সালের প্রতিবেদন বলছে, দেশের প্রায় সব মানুষই এই সীমার চেয়ে বেশি দূষিত এলাকায় বাস করেন।
ওই প্রতিবেদনের (২০২৩ সালের তথ্যভিত্তিক) হিসাবে, বাতাস ডব্লিউএইচওর মানে নামিয়ে আনা গেলে একজন বাংলাদেশির গড় আয়ু প্রায় সাড়ে ৫ বছর এবং ঢাকার একজন বাসিন্দার গড় আয়ু প্রায় ৬ দশমিক ৯ বছর বাড়তে পারত। স্বল্পমেয়াদে দূষিত বাতাস কাশি, গলা ও চোখ জ্বালা, শ্বাসকষ্ট এবং হাঁপানির টান বাড়ায়; দীর্ঘমেয়াদে হৃদ্রোগ, স্ট্রোক, সিওপিডি ও ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়। শিশু, বয়স্ক, অন্তঃসত্ত্বা নারী এবং আগে থেকে শ্বাসতন্ত্র বা হৃদ্রোগে ভোগা ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে।
পাঠকের জন্য করণীয়: দূষিত দিনে কীভাবে নিজেকে রক্ষা করবেন
- বের হওয়ার আগে সূচক দেখুন: মোবাইল অ্যাপ বা ওয়েবসাইটে একিউআই ১৫০ ছাড়ালে অপ্রয়োজনীয় বাইরে যাওয়া কমান।
- ভালো মানের মাস্ক: সাধারণ কাপড় বা সার্জিক্যাল মাস্ক পিএম২.৫ ঠেকাতে কম কার্যকর; মুখে ঠিকমতো বসে এমন এন৯৫ বা কেএন৯৫ মাস্ক বেশি সুরক্ষা দেয়।
- বাইরে ব্যায়াম নয়: দূষণ বেশি থাকলে ভোরে বা সন্ধ্যায় খোলা জায়গায় দৌড়ানো বা ভারী ব্যায়াম এড়িয়ে চলুন, কারণ তখন শ্বাস গভীর হয় এবং বেশি কণা ফুসফুসে ঢোকে।
- ঘরের বাতাস: দূষণের সময় জানালা বন্ধ রাখুন; ঘরে ধূমপান, মশার কয়েল বা খোলা চুলার ধোঁয়া কমান।
- ঝুঁকিপূর্ণদের যত্ন: হাঁপানি বা সিওপিডির রোগীরা চিকিৎসকের দেওয়া ইনহেলার ও ওষুধ হাতের কাছে রাখুন; শ্বাসকষ্ট, বুকে চাপ বা টানা কাশি বাড়লে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
- পর্যাপ্ত পানি পান: গলা ও শ্বাসনালি আর্দ্র রাখতে পানি পান করুন; বাইরে থেকে ফিরে মুখ-হাত ধুয়ে নিন।
প্রশ্নোত্তর
ছুটির দিনে যানবাহন কম, তবু দূষণ কেন?
যানবাহন দূষণের একটি উৎস মাত্র। ইটভাটা, নির্মাণকাজের ধুলা, বর্জ্য পোড়ানো, আঞ্চলিক দূষিত বাতাস এবং শীতের স্থির আবহাওয়া মিলেই সূচক বাড়ে, তাই এক দিনের যান চলাচল কমলেই বাতাস পরিষ্কার হয় না।
সামনের দিনগুলোতে কি পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে?
গত কয়েক বছরের ধারা অনুযায়ী ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি ঢাকায় দূষণ সবচেয়ে বেশি থাকে। তাই এখন থেকেই সতর্কতা নেওয়া জরুরি।
তথ্যসূত্র: আইকিউএয়ার, এশিয়ান টিভি অনলাইন, ডেইলি বাংলা পোস্ট, প্রবাসীর দিগন্ত, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের এনার্জি পলিসি ইনস্টিটিউট (এয়ার কোয়ালিটি লাইফ ইনডেক্স)।
মন্তব্য (০)