সরকারি অফিসে জাতীয় পতাকা ব্যবহারে নতুন নির্দেশনা, সম্মান ও মর্যাদা রক্ষায় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের চিঠি
বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার যথাযথ ব্যবহার, সম্মান ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে সরকারি ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। জাতীয় পতাকা বিধিমালা, ১৯৭২ অনুসরণ করে পতাকা প্রদর্শনের ক্ষেত্রে নির্ধারিত নিয়ম মেনে চলা এবং পতাকাকে কোনোভাবেই অনুপযুক্ত কাজে ব্যবহার না করার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের বিধি শাখা থেকে ১১ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে জারি করা একটি সরকারি স্মারকে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়। চিঠিটি সিনিয়র সচিব ও সচিবদের কাছে পাঠানো হয়েছে। এতে জাতীয় পতাকার প্রতি যথাযথ সম্মান ও মর্যাদা প্রদর্শনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
সরকারি স্মারকটি এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন জাতীয় প্রতীকের সঠিক ব্যবহার, সরকারি প্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা এবং জাতীয় মর্যাদা রক্ষার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
জাতীয় পতাকা ব্যবহারে যেসব অনিয়মের কথা তুলে ধরা হয়েছে
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, সরকারি ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কিছু কর্মকর্তা বা ব্যক্তি জাতীয় পতাকা ব্যবহারের অধিকারী বা যোগ্য না হওয়া সত্ত্বেও অফিসকক্ষে চেয়ার বা সোফার পেছনে ঢিলেঢালাভাবে জাতীয় পতাকা ঝুলিয়ে প্রদর্শন করছেন। এ ধরনের ব্যবহারের বিষয়ে আপত্তি তুলে ধরে জাতীয় পতাকার নির্ধারিত মর্যাদা বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।
চিঠিতে জাতীয় পতাকা ব্যবহারের ক্ষেত্রে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরা হয়েছে।
১. নির্ধারিত নিয়মে পতাকা প্রদর্শন: জাতীয় পতাকা বিধিমালা, ১৯৭২ অনুযায়ী সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত জাতীয় পতাকা প্রদর্শনের বিধান রয়েছে। তবে মোটরগাড়ি, জলযান ও উড়োজাহাজের ক্ষেত্রে বিধিমালায় নির্দিষ্ট ব্যতিক্রম রয়েছে।
২. অফিসকক্ষে পতাকার ব্যবহার: কিছু অফিসে জাতীয় পতাকা স্থায়ীভাবে ঝুলিয়ে রাখা হচ্ছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে নির্ধারিত বিধি অনুসরণ করা এবং পতাকার যথাযথ মর্যাদা বজায় রাখা প্রয়োজন।
৩. পতাকার আকৃতি, অনুপাত ও রং: জাতীয় পতাকার নির্ধারিত আকৃতি, অনুপাত ও রং সঠিকভাবে বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এসব বৈশিষ্ট্য যথাযথভাবে অনুসরণ না করে পতাকা ব্যবহার করা হলে তা জাতীয় পতাকার স্বীকৃত নকশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় না।
৪. সাজসজ্জা বা ব্যক্তিগত পরিচিতির উপকরণ হিসেবে ব্যবহার: অফিসকক্ষের অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জা, অলংকরণ কিংবা ব্যক্তিগত বা সাংগঠনিক পরিচিতির পটভূমি হিসেবে জাতীয় পতাকা ব্যবহার করার বিষয়টিও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ধরনের ব্যবহার বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত, পতাকা ও প্রতীক-সংক্রান্ত আদেশ, ১৯৭২ এবং জাতীয় পতাকা বিধিমালা, ১৯৭২-এর আলোকে বিবেচনার কথা বলা হয়েছে।
কোন আইন ও বিধিমালার কথা বলা হয়েছে?
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের স্মারকে জাতীয় পতাকা ব্যবহারের ক্ষেত্রে দুটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি ভিত্তির উল্লেখ রয়েছে।
বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত, পতাকা ও প্রতীক-সংক্রান্ত আদেশ, ১৯৭২।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের পতাকা বিধিমালা, ১৯৭২।
জাতীয় পতাকার ব্যবহার কীভাবে হবে, কোন পরিস্থিতিতে তা প্রদর্শন করা যাবে এবং এর মর্যাদা কীভাবে সংরক্ষণ করতে হবে—এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিধান অনুসরণ করা প্রয়োজন। ফলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ যাঁরা জাতীয় পতাকা ব্যবহার করেন, তাঁদের জন্য প্রযোজ্য নিয়ম সম্পর্কে সচেতন থাকা গুরুত্বপূর্ণ।
তবে চিঠিতে পতাকা ব্যবহারের বিষয়ে অনিয়মের কথা উল্লেখ করা হলেও, এ স্মারকে নতুন কোনো শাস্তি বা জরিমানার বিধান ঘোষণা করা হয়েছে—এমন তথ্য দৃশ্যমান নথিতে নেই। তাই নির্দেশনাটিকে নতুন শাস্তিমূলক আইন হিসেবে উপস্থাপন করা সঠিক হবে না।
মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোকে কী করতে বলা হয়েছে?
চিঠির দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে জাতীয় পতাকার প্রতি যথাযথ সম্মান ও মর্যাদা প্রদর্শনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অধীনস্থ দপ্তর এবং স্বায়ত্তশাসিত, সংবিধিবদ্ধ ও আধা-সরকারি সংস্থাগুলোকে নির্দেশনা দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়েছে।
এ নির্দেশনার আওতায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো তাদের অধীন দপ্তর, অফিস এবং সংস্থাগুলোতে জাতীয় পতাকা ব্যবহারের প্রচলিত পদ্ধতি পর্যালোচনা করতে পারে। বিশেষ করে অফিসকক্ষে পতাকা প্রদর্শন, পতাকার সঠিক নকশা বজায় রাখা এবং বিধিবহির্ভূত ব্যবহার এড়ানোর বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বার্তা
সরকারি অফিসে জাতীয় পতাকা কেবল একটি আনুষ্ঠানিক প্রতীক নয়; এটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় পরিচয়ের প্রতীক। তাই পতাকা ব্যবহারের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত পছন্দ বা অফিসের সাজসজ্জার পরিবর্তে নির্ধারিত বিধিমালা অনুসরণ করা জরুরি।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এ চিঠি থেকে স্পষ্ট যে, জাতীয় পতাকার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সরকারি ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে নির্দেশনা পৌঁছে দেওয়া এবং বিধিমালার প্রতি সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।
বিশেষ করে অফিসকক্ষে চেয়ার বা সোফার পেছনে পতাকা ঝুলিয়ে রাখা, নির্ধারিত নকশা অনুসরণ না করা কিংবা ব্যক্তিগত ও সাংগঠনিক সাজসজ্জায় পতাকা ব্যবহারের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিধান যাচাই করা উচিত। কোনো ব্যক্তি বা পদধারী জাতীয় পতাকা ব্যবহারের বিশেষ অধিকারী কি না, সেটিও প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী নির্ধারণ করতে হবে।
চিঠির তারিখ ও স্মারকসংক্রান্ত তথ্য
প্রাপ্ত নথিতে দৃশ্যমান তথ্য অনুযায়ী—
প্রেরণকারী দপ্তর: গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, বিধি শাখা।
চিঠি জারির তারিখ: ১১ অক্টোবর ২০২৬।
বিষয়: জাতীয় পতাকার প্রতি যথাযথ সম্মান ও মর্যাদা প্রদর্শন।
প্রাপক: সিনিয়র সচিব/সচিব (সকল)।
স্বাক্ষরকারী: শারমিন ইয়াসমিন, উপসচিব।
অনুলিপি: সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের অতিরিক্ত সচিব, সচিবের একান্ত সচিব, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং প্রতিস্থাপিত একান্ত সচিবদের কাছে পাঠানোর তথ্য রয়েছে।
শেষ কথা
জাতীয় পতাকার সম্মান রক্ষা করা রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব। সরকারি প্রতিষ্ঠানে পতাকা প্রদর্শনের ক্ষেত্রেও প্রচলিত আইন ও বিধিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা প্রয়োজন। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ১১ অক্টোবরের স্মারকটি মূলত জাতীয় পতাকার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং সরকারি ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোতে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা পৌঁছে দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।


