সরকারি সেবা

দেশের সব বেসরকারি দাখিল-আলিম মাদ্রাসার কমিটি পুনর্গঠনের নির্দেশ, দ্রুত গঠন হবে অ্যাডহক কমিটি

দেশের সব বেসরকারি দাখিল ও আলিম মাদ্রাসার বিদ্যমান ম্যানেজিং কমিটি ও গভর্নিং বডি পুনর্গঠনের নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড। একই সঙ্গে বিদ্যমান কমিটির পরিবর্তে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করে দ্রুত অ্যাডহক কমিটি গঠনের অনুমতি নিতে বলা হয়েছে। বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখের জরুরি নির্দেশনায় এ তথ্য জানানো হয়েছে। বোর্ডের অফিসিয়াল নোটিশ তালিকাতেও একই দিনে এ নির্দেশনা প্রকাশ করা হয়েছে।

নতুন নির্দেশনাটি শুধু একটি বা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের জন্য নয়; দেশের সব বেসরকারি দাখিল ও আলিম মাদ্রাসার বিদ্যমান ম্যানেজিং কমিটি ও গভর্নিং বডি এর আওতায় পড়বে। ফলে সংশ্লিষ্ট মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠানপ্রধান, বর্তমান কমিটির সভাপতি ও সদস্য এবং প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষকে নতুন বিধান অনুযায়ী পরবর্তী কার্যক্রম নিতে হবে।

কেন এই নির্দেশনা

কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখের নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড ২৯ সেপ্টেম্বর এ সংক্রান্ত জরুরি নির্দেশনা জারি করে। বোর্ডের চিঠিতে দাখিল ও আলিম স্তরের বেসরকারি মাদ্রাসার গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটি-সংক্রান্ত ২০২৫ সালের প্রবিধানমালা এবং এর সংশোধিত বিধান অনুসরণ করে বিদ্যমান কমিটিগুলো পুনর্গঠনের কথা বলা হয়েছে।

বোর্ডের নোটিশে আরও বলা হয়েছে, দ্রুত অ্যাডহক কমিটি গঠনের অনুমতি গ্রহণ করে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হবে। একই সঙ্গে ২ আগস্ট ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের জারি করা নির্দেশনার অন্যান্য বিষয় অপরিবর্তিত থাকবে। এ কারণে নতুন নির্দেশনাকে আগের কার্যক্রমের ধারাবাহিক অংশ হিসেবেও দেখা যাচ্ছে।


সভাপতি মনোনয়নে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন

নতুন নির্দেশনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর একটি হলো মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সভাপতি মনোনয়নের প্রক্রিয়া।

বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, সংশোধিত প্রবিধান অনুযায়ী মাদ্রাসার প্রধানকে স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) ও জেলা প্রশাসকের (ডিসি) মাধ্যমে সম্ভাব্য সভাপতিদের মধ্য থেকে ৩ জনের একটি তালিকা প্রস্তুত করতে হবে। এরপর অন্যান্য সদস্যের মনোনয়নসহ প্রস্তাব শিক্ষা বোর্ডে পাঠাতে হবে।

সভাপতি হিসেবে প্রস্তাবিত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে সংশোধিত বিধানে কয়েকটি শ্রেণির কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেন—

  • শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি;
  • খ্যাতিমান সমাজসেবক;
  • জনপ্রতিনিধি;
  • কর্মরত সরকারি কর্মচারী;
  • অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী।

তবে সরকারি কর্মচারীদের ক্ষেত্রে নথিতে ৯ম গ্রেড বা তদূর্ধ্ব পদমর্যাদার কথা উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট যোগ্যতা পূরণকারী কর্মরত বা অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীদের মধ্য থেকেও সভাপতি মনোনয়নের জন্য নাম প্রস্তাব করা যেতে পারে।

এ ক্ষেত্রে সরাসরি একজনকে সভাপতি হিসেবে নির্ধারণের পরিবর্তে তিনজনের তালিকা তৈরি করে শিক্ষা বোর্ডের কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।


সিটি করপোরেশন এলাকার মাদ্রাসায় আলাদা প্রক্রিয়া

সিটি করপোরেশনের আওতাধীন মাদ্রাসাগুলোর ক্ষেত্রে সভাপতি মনোনয়ন প্রস্তাব পাঠানোর পদ্ধতিতে কিছুটা পার্থক্য রাখা হয়েছে।

নির্দেশনায় বলা হয়েছে, এসব মাদ্রাসার ক্ষেত্রে মাদ্রাসা প্রধান বিভাগীয় কমিশনারের মাধ্যমে শিক্ষা বোর্ডের কাছে প্রস্তাব পাঠাবেন।

অন্যদিকে সাধারণ এলাকার ক্ষেত্রে স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রস্তাব তৈরির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

ফলে মাদ্রাসাটি কোথায় অবস্থিত—সিটি করপোরেশন নাকি অন্যান্য প্রশাসনিক এলাকায়—তার ওপর সভাপতি মনোনয়ন প্রস্তাব পাঠানোর প্রশাসনিক মাধ্যম নির্ভর করবে।


অ্যাডহক কমিটি গঠনের বিষয়টি কেন গুরুত্বপূর্ণ

নতুন নির্দেশনায় দ্রুত অ্যাডহক কমিটি গঠনের অনুমতি নেওয়ার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের ডিজিটাল সেবা তালিকাতেও বেসরকারি মাদ্রাসার জন্য অনলাইনে অ্যাডহক কমিটি গঠনের অনুমতি, অ্যাডহক কমিটি চলাকালে সভাপতি মনোনয়নসহ গভর্নিং বডি অনুমোদন এবং সভাপতি মনোনয়নসহ ম্যানেজিং কমিটি অনুমোদনের পৃথক সেবার উল্লেখ রয়েছে।

এ থেকে বোঝা যায়, অ্যাডহক কমিটি গঠনকে পরবর্তী নিয়মিত ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডি গঠনের প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ধাপ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অনলাইন কার্যক্রমেও ২৯ সেপ্টেম্বর বিভিন্ন মাদ্রাসার সভাপতি মনোনয়নসহ অ্যাডহক কমিটি অনুমোদন-সংক্রান্ত আদেশ প্রকাশিত হয়েছে।


মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের এখন কী করতে হবে

নতুন নির্দেশনার আলোকে সংশ্লিষ্ট মাদ্রাসাগুলোর জন্য মূল কার্যক্রমগুলোকে সহজভাবে কয়েকটি ধাপে দেখা যায়।

১. বিদ্যমান কমিটির অবস্থা যাচাই

প্রথমে মাদ্রাসার বর্তমান ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির অবস্থা যাচাই করতে হবে এবং পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নিতে হবে।

২. অ্যাডহক কমিটির অনুমতি

প্রয়োজন অনুযায়ী বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের কাছ থেকে অ্যাডহক কমিটি গঠনের অনুমতি নিতে হবে।

৩. সভাপতির জন্য তিনজনের তালিকা

সংশোধিত বিধান অনুযায়ী যোগ্য ব্যক্তিদের মধ্য থেকে সভাপতির জন্য তিনজনের একটি তালিকা প্রস্তুত করতে হবে।

৪. প্রশাসনিক মাধ্যমে প্রস্তাব পাঠানো

সাধারণ এলাকার মাদ্রাসায় ইউএনও ও জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে এবং সিটি করপোরেশন এলাকার মাদ্রাসায় বিভাগীয় কমিশনারের মাধ্যমে প্রস্তাব পাঠানোর ব্যবস্থা অনুসরণ করতে হবে।

৫. শিক্ষা বোর্ডে প্রস্তাব

সভাপতি ও অন্যান্য সদস্যের প্রস্তাব সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে পাঠাতে হবে।

৬. বোর্ডের অনুমোদন

বোর্ডের বিধি ও অনুমোদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কমিটির কার্যক্রম এগিয়ে যাবে।


কারা এই নির্দেশনার আওতায়

বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের প্রকাশিত নোটিশের ভাষা অনুযায়ী নির্দেশনাটি দেশের সকল বেসরকারি দাখিল ও আলিম মাদ্রাসার বিদ্যমান ম্যানেজিং কমিটি ও গভর্নিং বডির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

অর্থাৎ শুধু কোনো নির্দিষ্ট জেলা, উপজেলা বা বিশেষ ধরনের মাদ্রাসার জন্য নয়—বোর্ডের আওতাধীন বেসরকারি দাখিল ও আলিম পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানগুলোর বিদ্যমান পরিচালনা কাঠামোই এ পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার আওতায় এসেছে।

নির্দেশনার অনুলিপি সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের কাছেও পাঠানো হয়েছে, যাতে মাঠপর্যায়ে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সমন্বয় করা যায়।


২০২৫ সালের প্রবিধানমালার সঙ্গে সম্পর্ক

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড ইতোমধ্যে দাখিল ও আলিম স্তরের বেসরকারি মাদ্রাসার গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটি প্রবিধানমালা, ২০২৫-এর সংশোধিত প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করেছে।

২৯ সেপ্টেম্বরের নতুন নির্দেশনাটি ওই সংশোধিত বিধানের আলোকে কমিটি পুনর্গঠনের কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত।

অর্থাৎ, নতুন করে কোনো অনানুষ্ঠানিক পদ্ধতি তৈরি না করে প্রবিধানমালায় নির্ধারিত কাঠামোর মধ্যেই কমিটি পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া পরিচালনা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।


শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য কী অর্থ

এই নির্দেশনার ফলে মাদ্রাসার পরিচালনা কাঠামোতে পরিবর্তন আসতে পারে। সভাপতি ও সদস্য পরিবর্তনের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে নতুন কমিটির ভূমিকা তৈরি হবে।

তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কমিটি পুনর্গঠনের এই নির্দেশনা নিজে থেকে কোনো শিক্ষক-কর্মচারীর চাকরি, এমপিও, বেতন-ভাতা বা পদ পরিবর্তনের আদেশ নয়। এসব বিষয়ে আলাদা বিধি, সরকারি আদেশ বা বোর্ডের পৃথক সিদ্ধান্ত প্রযোজ্য হবে।

তাই শুধু নতুন কমিটি গঠনের কারণে শিক্ষক-কর্মচারীদের এমপিও বা চাকরির বিষয়ে স্বয়ংক্রিয় পরিবর্তন হবে—এমন সিদ্ধান্ত এই নোটিশ থেকে নেওয়া ঠিক হবে না।


এক নজরে পুরো নির্দেশনা

বিষয়বিস্তারিত
নির্দেশদাতাবাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড
নির্দেশনার তারিখ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রযোজ্য প্রতিষ্ঠানসব বেসরকারি দাখিল ও আলিম মাদ্রাসা
বর্তমান কমিটিম্যানেজিং কমিটি ও গভর্নিং বডি
মূল নির্দেশনাবিদ্যমান কমিটি পুনর্গঠন
অন্তর্বর্তী ব্যবস্থাদ্রুত অ্যাডহক কমিটি গঠনের অনুমতি
সভাপতি প্রস্তাব৩ জনের তালিকা
সম্ভাব্য সভাপতিশিক্ষানুরাগী, সমাজসেবক, জনপ্রতিনিধি, ৯ম গ্রেড বা তদূর্ধ্ব সরকারি কর্মচারীসহ বিধিতে নির্ধারিত যোগ্য ব্যক্তিরা
সাধারণ এলাকার প্রক্রিয়াইউএনও ও ডিসির মাধ্যমে
সিটি করপোরেশন এলাকার প্রক্রিয়াবিভাগীয় কমিশনারের মাধ্যমে
ভিত্তি২০২৫ সালের প্রবিধানমালা ও সংশোধিত বিধান
২ আগস্টের নির্দেশনাঅন্যান্য বিষয় অপরিবর্তিত

শেষ কথা

বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের ২৯ সেপ্টেম্বরের নির্দেশনার ফলে দেশের বেসরকারি দাখিল ও আলিম মাদ্রাসাগুলোর বিদ্যমান ম্যানেজিং কমিটি ও গভর্নিং বডি পুনর্গঠনের একটি সমন্বিত কার্যক্রম শুরু হলো। এর প্রথম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দ্রুত অ্যাডহক কমিটি গঠনের অনুমতি নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

একই সঙ্গে সভাপতি মনোনয়নের ক্ষেত্রে তিনজনের তালিকা, প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে প্রস্তাব পাঠানো এবং সংশোধিত প্রবিধান অনুসরণের বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে। সিটি করপোরেশন এলাকার মাদ্রাসার জন্য বিভাগীয় কমিশনারের মাধ্যমে প্রস্তাব পাঠানোর বিধানও আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

ফলে এখন সংশ্লিষ্ট মাদ্রাসাগুলোর প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও পরিচালনা সংশ্লিষ্টদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—নতুন নির্দেশনা, ২০২৫ সালের সংশোধিত প্রবিধান এবং ২ আগস্টের পূর্ববর্তী নির্দেশনা সমন্বয় করে যথাযথ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় অ্যাডহক কমিটি ও পরবর্তী পরিচালনা কমিটি গঠনের কার্যক্রম সম্পন্ন করা।

Source File

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *