সব খাতে একক ১৫% ভ্যাট: অর্থনৈতিক সংস্কার নাকি মূল্যস্ফীতির নতুন ঝুঁকি?
বাংলাদেশের জাতীয় রাজস্ব ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তনের লক্ষ্যে সব খাতে একক ১৫% ভ্যাট (মূল্য সংযোজন কর) আরোপের বিষয়টি নিয়ে নীতি-নির্ধারণী মহলে জোর আলোচনা চলছে। আপাতদৃষ্টিতে এই সিদ্ধান্তকে আধুনিক ও বৈশ্বিক মানদণ্ডের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে হলেও, দেশের বর্তমান আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে এটি কতটা কার্যকর হবে তা নিয়ে দেখা দিয়েছে গভীর সংশয়। অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকদের মতে, প্রস্তুতি ছাড়া এই “বিপ্লবী” পদক্ষেপ হিতে বিপরীত হয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।
নীতির আদর্শ রূপ বনাম কঠিন বাস্তবতা
একটি আদর্শ ভ্যাট ব্যবস্থায় একক হার (Single Rate) সবচেয়ে বেশি কার্যকর। এতে কর ফাঁকি দেওয়া কঠিন হয়, স্বচ্ছতা বাড়ে এবং একটি নিরবচ্ছিন্ন ‘ক্রেডিট চেইন’ (Input Tax Credit) তৈরি হয়। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। আমাদের দেশের অধিকাংশ ব্যবসায়ী এখনো ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিট (ITC) বা রেয়াত গ্রহণ পদ্ধতিতে অভ্যস্ত নন। ফলে ভ্যাটকে তারা ব্যবসার খরচ হিসেবে দেখেন, যা সরাসরি পণ্যের দামের সাথে যুক্ত করা হয়।
অনিবার্য ৩টি বড় ঝুঁকি
বিশ্লেষকরা এই একক ১৫% ভ্যাট হার চালুর ক্ষেত্রে তিনটি প্রধান ঝুঁকির কথা উল্লেখ করেছেন:
১. মূল্যস্ফীতির তীব্র ধাক্কা (Price Shock): বর্তমানে অনেক নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবায় ৫% বা ৭.৫% ভ্যাট কার্যকর রয়েছে। এটি হঠাৎ ১৫% করা হলে বাজারে বড় ধরনের আতঙ্ক তৈরি হবে। ব্যবসায়ীরা কর রেয়াত না নিয়ে সরাসরি দাম বাড়িয়ে দেবেন, যার ফলে ভোক্তা পর্যায়ে চরম অসন্তোষ সৃষ্টি হতে পারে।
২. সিন্ডিকেটের নতুন হাতিয়ার: বাজারের অসাধু ব্যবসায়ীরা সরকারের এই কর সংস্কারকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। “ভ্যাট বেড়েছে” এই অজুহাতে তারা করের হারের চেয়েও কয়েক গুণ বেশি দাম বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের পকেট কাটবে।
৩. তদারকি ও এনফোর্সমেন্টের অভাব: ইলেকট্রনিক ফিসকাল ডিভাইস (EFD) বা আইভাস (iVAS) প্রযুক্তি চালু হলেও মাঠপর্যায়ে এর যথাযথ প্রয়োগ এখনো প্রশ্নবিদ্ধ। পর্যাপ্ত ডিজিটাল অবকাঠামো ও দক্ষ জনবল ছাড়া একক ভ্যাট হার বাস্তবায়ন করা মানেই হলো কর ফাঁকির নতুন পথ উন্মুক্ত করা।
বিশেষজ্ঞদের প্রস্তাবনা: সমাধান কী?
অর্থনীতিবিদদের মতে, সংস্কার হওয়া উচিত পরিকল্পিত এবং ধাপে ধাপে। হঠাৎ ১৫% ভ্যাট চাপিয়ে না দিয়ে নিচের পদক্ষেপগুলো নেওয়া যেতে পারে:
ধাপভিত্তিক হার বৃদ্ধি: প্রথমে ৫% থেকে বাড়িয়ে ৭.৫%, তারপর ১০% এবং বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে চূড়ান্তভাবে ১৫% করা যেতে পারে।
রেয়াত পদ্ধতি সহজ করা: ব্যবসায়ীরা যাতে সহজেই ITC সুবিধা পান, তা নিশ্চিত করতে হবে।
প্রযুক্তির শতভাগ ব্যবহার: ই-ইনভয়েসিং এবং ইএফডি মেশিন প্রতিটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক ও কার্যকর করা।
কঠোর নজরদারি: কর ফাঁকি রোধে এনবিআর-এর মাঠপর্যায়ের সক্ষমতা বাড়ানো।
উপসংহার
রাজস্ব বাড়ানো যেকোনো রাষ্ট্রের লক্ষ্য হতে পারে, তবে তা যেন সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে ধ্বংস না করে। নীতিনির্ধারকদের মনে রাখা প্রয়োজন, “একক হার কোনো জাদু নয়, বরং পরিপালনই (Compliance) হলো আসল চাবিকাঠি।” পর্যাপ্ত প্রস্তুতি এবং ব্যবসায়ীদের মধ্যে পরিপালন সংস্কৃতি গড়ে না তুলে ১৫% ভ্যাট কার্যকর করা হলে এটি কর সংস্কার নয়, বরং ১৫% মূল্যবৃদ্ধির সমার্থক হিসেবে গণ্য হবে। একটি ন্যায়ভিত্তিক ও টেকসই করব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে হঠকারী সিদ্ধান্তের চেয়ে কার্যকর কৌশলের দিকেই বেশি নজর দেওয়া প্রয়োজন।



