এইমাত্র পাওয়া

হিসাববিদের হাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক: নতুন গভর্নরের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনার সমীকরণ

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের চেয়ারে বরাবরই অর্থনীতিবিদ বা আমলাদের দাপট দেখা গেছে। তবে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের শীর্ষ পদে আসীন হয়েছেন একজন পেশাদার হিসাববিদ ও সফল পোশাক রফতানিকারক মো. মোস্তাকুর রহমান। তাঁর নিয়োগ নিয়ে শুরুতে নানামুখী আলোচনা ও সমালোচনা থাকলেও, দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম কয়েক দিনেই তিনি তাঁর দূরদর্শী কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে ইতিবাচক বার্তা দিতে শুরু করেছেন।

হিসাববিদের যোগ্যতা ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট

যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েল এবং আইএমএফ-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বিভিন্ন সময়ে বলেছেন যে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হতে হলে কেবল অর্থনীতিবিদ হওয়া জরুরি নয়; একজন সচেতন হিসাববিদও এই পদের জন্য অত্যন্ত যোগ্য। কারণ, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং সুদের হারের ভারসাম্য রক্ষা করার মূল কাজটি আসলে জটিল এক হিসাবেরই অংশ। মোস্তাকুর রহমানের নিয়োগ যেন সেই আন্তর্জাতিক ধারণারই প্রতিফলন।

উৎপাদন ও কর্মসংস্থান: অগ্রাধিকারের শীর্ষে

দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই নতুন গভর্নর স্পষ্ট করেছেন যে, তাঁর প্রধান লক্ষ্য হবে উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের জন্য তিনি বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্প-কারখানা পুনরায় চালুর ওপর জোর দিয়েছেন। তাঁর মতে, সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রেখে বিনিয়োগনির্ভর প্রবৃদ্ধি অর্জন করাই হবে বর্তমান সময়ের বড় চ্যালেঞ্জ।

ব্যাংকিং খাতের সংস্কার ও শৃঙ্খলা

সদ্য বিদায়ী গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোর যে কাজ শুরু করেছিলেন, মোস্তাকুর রহমান তা এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। এসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি) এর সাথে বৈঠকে তিনি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন:

  • রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যাংকিং: ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের রাজনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার না করতে ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের নির্দেশ দিয়েছেন।

  • ব্যাংক একীভূতকরণ: পূর্বঘোষিত ব্যাংক একীভূত করার প্রক্রিয়া চলমান থাকবে।

  • আমানত বৃদ্ধি ও খেলাপি ঋণ: আমানত বাড়ানোর পাশাপাশি ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে টাকা আদায়ে প্রচলিত ব্যবস্থার বাইরে বিকল্প ও উদ্ভাবনী পথ খোঁজার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

ব্যবসায়ী থেকে গভর্নর: শিল্পের পালস বোঝা

একজন সাবেক সফল ব্যবসায়ী হিসেবে মোস্তাকুর রহমান উচ্চ সুদহারের নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে অবগত। শিল্পপতিদের প্রত্যাশা, তিনি বিনিয়োগবান্ধব সুদের হার নিশ্চিত করবেন। তবে একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান রক্ষায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে তিনি অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করেছেন।

বিশেষ করে পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে রফতানিমুখী পোশাক শ্রমিকদের বেতন-বোনাস পরিশোধের জন্য সহজ শর্তে বিশেষ ঋণ চালুর উদ্যোগ নিয়ে তিনি মালিক ও শ্রমিক—উভয় পক্ষের প্রশংসা কুড়িয়েছেন। বিজিএমইএ নেতারা এই পদক্ষেপকে সময়োপযোগী ও সাহসী বলে অভিহিত করেছেন।

বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন

সাবেক গভর্নর ফজলে কবির নতুন গভর্নরের অগ্রাধিকারমূলক পদক্ষেপগুলোর প্রশংসা করে বলেন, “তিনি ব্যবসায়ী হওয়ায় উদ্যোক্তাদের সমস্যাগুলো দ্রুত অনুধাবন করতে পারছেন।” তবে তিনি এও মনে করিয়ে দেন যে, মাত্র কয়েক দিনের কার্যক্রমে সার্বিক মূল্যায়ন সম্ভব নয়।

ব্যাংকার নূরুল আমিনের মতে, একজন হিসাববিদ ও ব্যবসায়ী হিসেবে মোস্তাকুর রহমান ব্যবসা-বাণিজ্যের ‘পালস’ বা নাড়ি নক্ষত্র বোঝেন, যা ব্যাংক খাতের সংস্কারে সহায়ক হবে।


সারসংক্ষেপ: মো. মোস্তাকুর রহমানের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো ব্যবসায়ীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং ভঙ্গুর ব্যাংক খাতে সুশাসন ফিরিয়ে আনা। হিসাববিদের সূক্ষ্ম হিসাব আর ব্যবসায়ীর বাস্তব অভিজ্ঞতা মিলে দেশের অর্থনীতি কতটা ঘুরে দাঁড়ায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *