এইমাত্র পাওয়া

মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা জোরদারে বড় উদ্যোগ, প্রস্তাবে প্রায় ১ লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী

দেশের তৃণমূল ও নগর পর্যায়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা আরও শক্তিশালী করতে বড় ধরনের জনবল কাঠামো তৈরির উদ্যোগের তথ্য সামনে এসেছে। প্রচারিত একটি পরিকল্পনা-চিত্রে ইউনিয়ন, ওয়ার্ড ও সিটি করপোরেশনভিত্তিক Health & Wellbeing Center পরিচালনার জন্য নতুন করে ‘স্বাস্থ্য কর্মী’ (Health & Wellbeing Worker) পদ সৃষ্টির প্রস্তাব দেখানো হয়েছে।

তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—চিত্রটিতে যে সংখ্যাগুলো দেওয়া হয়েছে, সেগুলোকে এখনই চূড়ান্ত সরকারি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি বা অনুমোদিত পদসংখ্যা হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। বরং এটিকে প্রস্তাবিত জনবল কাঠামো ও ধাপভিত্তিক নিয়োগ পরিকল্পনা হিসেবে দেখা উচিত।

সরকার ইতোমধ্যে স্বাস্থ্য খাতের জনবল সংকট কমাতে পর্যায়ক্রমে প্রায় ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের উদ্যোগের কথা জানিয়েছে। ১৩ জুলাই ২০২৬ সংসদে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, সরকারি হাসপাতাল ও মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবায় জনবল সংকট মোকাবিলায় পর্যায়ক্রমে ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

নতুন ‘স্বাস্থ্য কর্মী’ পদ সৃষ্টির প্রস্তাব কেন

প্রচারিত তথ্যচিত্রে বলা হয়েছে, তৃণমূল ও নগর পর্যায়ের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও সুস্বাস্থ্য সুরক্ষা সরাসরি পৌঁছে দেওয়া এবং সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর সেবার গুণগত মান বাড়ানোর লক্ষ্যেই নতুন কাঠামোর চিন্তা করা হয়েছে।

বর্তমানে মাঠপর্যায়ে বিভিন্ন ব্যবস্থাপনায় স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হলেও **Health Assistant, Family Welfare Assistant (FWA), Community Health Care Provider (CHCP)**সহ বিভিন্ন পদ ও ব্যবস্থাপনার মধ্যে দায়িত্ব বণ্টন রয়েছে। নতুন ব্যবস্থার মাধ্যমে এসব সেবাকে আরও সমন্বিত করার লক্ষ্য থাকতে পারে।

তথ্যচিত্রে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, কাজের পুনরাবৃত্তি ও জনবল ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা এবং শহরাঞ্চলে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কারণে নতুন উদ্যোগটি বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।

শহর ও গ্রাম—দুই পর্যায়েই জনবল

প্রচারিত প্রস্তাবের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো—শুধু গ্রামীণ ইউনিয়ন নয়, নগর ও গ্রামীণ উভয় পর্যায়েই নতুন স্বাস্থ্যসেবা কাঠামো তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রস্তাবিত কাঠামোয় ইউনিয়ন, ওয়ার্ড ও সিটি করপোরেশনভিত্তিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রকে কেন্দ্র করে Health & Wellbeing Center গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে জনগণের আরও কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার একটি সমন্বিত মডেল তৈরির চিন্তা রয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের Facility Registry-তেও দেশের বিভিন্ন এলাকায় ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের বিস্তৃত নেটওয়ার্কের তথ্য রয়েছে, যা মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্য অবকাঠামোর ব্যাপকতা তুলে ধরে। Central HRIS

তিন ধাপে নিয়োগের হিসাব

প্রচারিত তথ্যচিত্রে নগর পর্যায়ের জনবল তিন ধাপে নিয়োগের একটি হিসাব দেওয়া হয়েছে। সেখানে প্রথম বছরে ২০ শতাংশ, দ্বিতীয় বছরে ৪০ শতাংশ এবং তৃতীয় বছরে আরও ৪০ শতাংশ জনবল নিয়োগের কাঠামো দেখানো হয়েছে।

অন্যদিকে গ্রামীণ পর্যায়ে প্রথম বছরে কোনো নিয়োগ না রেখে দ্বিতীয় ও তৃতীয় বছরে ৫০ শতাংশ করে জনবল নিয়োগের হিসাব দেখানো হয়েছে।

অর্থাৎ পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে একসঙ্গে বিপুল সংখ্যক কর্মী নিয়োগ না করে কয়েক ধাপে মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় জনবল যুক্ত করার একটি পরিকল্পনা হতে পারে।

কেন এত বড় নিয়োগের প্রয়োজন হচ্ছে

মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি বর্তমানে স্বাস্থ্য খাতের অন্যতম বড় সমস্যা। জুলাই মাসে সংসদে দেওয়া তথ্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের অনুমোদিত ৬৫ হাজার ২৩০টি পদের বিপরীতে কর্মরত ছিলেন ৪৬ হাজার ২৮৩ জন। ফলে ওই পর্যায়ে ১৮ হাজার ৯৪৭টি পদ শূন্য ছিল। এর মধ্যে পরিবারকল্যাণ সহকারী, পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা এবং স্বাস্থ্য সহকারী পদেও উল্লেখযোগ্য শূন্যতা ছিল।

এ ছাড়া চিকিৎসক ও নার্সদের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের শূন্যপদ রয়েছে। ফলে নতুন জনবল কাঠামো বাস্তবায়নের উদ্দেশ্য শুধু নতুন পদ সৃষ্টি নয়; বিদ্যমান স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার জনবল সংকট কমানোও এর অন্যতম লক্ষ্য হতে পারে।

১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের বৃহত্তর পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্য

এখানেই নতুন প্রস্তাবটির গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। ২০২৬ সালের এপ্রিলেই সংসদে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

পরবর্তী সময়ে জুলাই মাসে তিনি জানান, এই নিয়োগ পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সময়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরেই প্রথম ধাপে ৪৫ হাজার ৭০০ জন নিয়োগের পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করা হয়।

তাই প্রচারিত নতুন Health & Wellbeing Worker কাঠামোকে স্বাস্থ্য খাতে সরকারের বৃহত্তর জনবল সম্প্রসারণ পরিকল্পনার একটি সম্ভাব্য অংশ হিসেবে দেখা যেতে পারে। তবে ৪৯,৭১১টি নতুন Health & Wellbeing Worker পদ ঠিক কোন সরকারি অনুমোদন বা প্রজ্ঞাপনের ভিত্তিতে চূড়ান্ত হয়েছে—তা পৃথকভাবে সরকারি নথি দিয়ে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

কোন পদগুলো দ্রুত পূরণের কথা বলা হয়েছে

তথ্যচিত্রের নিচের অংশে কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্টের সিএইচসিপি, স্বাস্থ্য সহকারী, পরিবার কল্যাণ সহকারী এবং পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শক (FPI)-এর শূন্য পদ দ্রুত নিয়োগের মাধ্যমে পূরণের নির্দেশনার কথা উল্লেখ রয়েছে।

এটি বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকা মাঠপর্যায়ের পদগুলো পূরণ হওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের সুযোগও বাড়তে পারে।

জনগণের জন্য কী পরিবর্তন আসতে পারে

নতুন কাঠামো বাস্তবায়ন হলে প্রত্যন্ত ও শহরের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসতে পারে।

প্রথমত, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা জনগণের বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছানোর সুযোগ বাড়বে।

দ্বিতীয়ত, স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে নিয়মিত জনবল নিশ্চিত হলে সাধারণ রোগের চিকিৎসা, স্বাস্থ্য পরামর্শ, মাতৃ ও শিশুসেবা, পরিবার পরিকল্পনা এবং প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা আরও কার্যকরভাবে দেওয়া সম্ভব হতে পারে।

তৃতীয়ত, উপজেলা বা জেলা পর্যায়ের হাসপাতালের ওপর প্রাথমিক চিকিৎসার চাপ কিছুটা কমতে পারে। কারণ ছোটখাটো স্বাস্থ্য সমস্যা স্থানীয় পর্যায়েই সমাধানের সুযোগ তৈরি হবে।

চতুর্থত, নগর দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্যও কমিউনিটি-ভিত্তিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার পরিধি বাড়তে পারে।

তবে নিয়োগের আগে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া জরুরি

এত বড় জনবল কাঠামো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শুধু পদ সৃষ্টি করলেই হবে না। নতুন পদগুলোর গ্রেড, বেতন স্কেল, নিয়োগযোগ্যতা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, দায়িত্ব, কর্মস্থল, নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ, পদোন্নতি, বদলি এবং প্রশিক্ষণ কাঠামো স্পষ্ট করা প্রয়োজন।

বিশেষ করে নতুন Health & Wellbeing Worker পদটি বিদ্যমান Health Assistant, FWA, CHCP বা অন্যান্য মাঠকর্মীর সঙ্গে কীভাবে সমন্বিত হবে—এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

কারণ দায়িত্বের মধ্যে যদি বড় ধরনের ওভারল্যাপ থাকে, তাহলে নতুন জনবল নিয়োগ করেও কাঙ্ক্ষিত দক্ষতা অর্জন করা কঠিন হতে পারে। বিপরীতে দায়িত্ব ও জবাবদিহি স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা গেলে নতুন কাঠামো মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

সংখ্যার ক্ষেত্রেও সরকারি অনুমোদনই চূড়ান্ত

প্রচারিত গ্রাফিকটিতে ৪৯,৭১১টি Health & Wellbeing Worker পদ সৃষ্টির প্রস্তাবের কথা বলা হয়েছে এবং তিন ধাপে নিয়োগের হিসাব দেখানো হয়েছে। তবে গ্রাফিকের বিভিন্ন ঘর ও মোট সংখ্যার মধ্যে দৃশ্যমান কিছু অসামঞ্জস্যও রয়েছে। ফলে প্রকাশিত সংখ্যাগুলোকে সরাসরি চূড়ান্ত নিয়োগ সংখ্যা হিসেবে প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর বা অনুমোদিত কমিটির নথি দিয়ে যাচাই করা জরুরি।

অন্যদিকে ২০২৬ সালের জুলাইয়ে সরকারিভাবে প্রায় ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী পর্যায়ক্রমে নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়ার কথা সংসদে জানানো হয়েছে—এটি অবশ্যই একটি স্বতন্ত্র ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি তথ্য।

সারসংক্ষেপ

সব মিলিয়ে, মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করতে নতুন Health & Wellbeing Center এবং Health & Wellbeing Worker-ভিত্তিক কাঠামোর প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

তবে ৪৯,৭১১টি পদ, নিয়োগের তিন ধাপ এবং নির্দিষ্ট পদসংখ্যা এখনই চূড়ান্ত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। সরকারি অনুমোদন, প্রজ্ঞাপন বা নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পরই পদসংখ্যা, গ্রেড, যোগ্যতা ও আবেদন প্রক্রিয়া নিশ্চিতভাবে বলা যাবে।

সরকারের বৃহত্তর ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ পরিকল্পনা এবং মাঠপর্যায়ে বিদ্যমান প্রায় ১৯ হাজার শূন্যপদের বাস্তবতা বিবেচনায় নিলে, স্বাস্থ্য খাতে আগামী সময়ে বড় পরিসরে নিয়োগ কার্যক্রম এগিয়ে যাওয়ার যথেষ্ট ভিত্তি রয়েছে।

সূত্র: সংসদে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য, সরকারি স্বাস্থ্যসেবা-সংক্রান্ত তথ্য এবং প্রচারিত প্রস্তাবিত জনবল কাঠামোর তথ্যচিত্র।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *