রাষ্ট্র সংস্কার ও বৈষম্যহীন অর্থনীতির প্রতিশ্রুতি: বিএনপির ২০২৬ সালের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি তাদের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত নির্বাচনী ইশতেহার ২০২৬ প্রকাশ করেছে। ‘সবার বাংলাদেশ’ শীর্ষক এই ইশতেহারে দলটি রাষ্ট্র ব্যবস্থার আমূল সংস্কার, ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনর্গঠন এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার এক সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা তুলে ধরেছে। জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করে বিএনপি এক নতুন ধারার রাজনৈতিক সংস্কৃতির অঙ্গীকার করেছে ।
রাষ্ট্র সংস্কার ও সুশাসন
ইশতেহারের প্রধান আকর্ষণ হলো রাষ্ট্র ব্যবস্থার সংস্কার। বিএনপি ক্ষমতায় গেলে ‘৩১ দফা’ ও ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে । উল্লেখযোগ্য সংস্কার প্রস্তাবগুলো হলো:
ক্ষমতার ভারসাম্য: প্রধানমন্ত্রীর একটানা মেয়াদের সময়সীমা সর্বোচ্চ ১০ বছর নির্ধারণ এবং উপ-রাষ্ট্রপতি পদ সৃষ্টি করা হবে ।
সংসদীয় সংস্কার: জাতীয় সংসদে একটি উচ্চকক্ষ প্রবর্তন করা হবে এবং বিরোধীদলীয় ডেপুটি স্পিকার নিয়োগ নিশ্চিত করা হবে ।
সংবিধান ও বিচার বিভাগ: সংবিধানে ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে পুনঃস্থাপন করা হবে । এছাড়া বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ এবং সুপ্রীম জুডিশিয়াল কাউন্সিল ব্যবস্থা কার্যকর করা হবে ।
দুর্নীতি দমন: বিএনপি দুর্নীতি দমনে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছে। দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) সম্পূর্ণ স্বাধীন করা, ন্যায়পাল নিয়োগ এবং অর্থপাচার রোধে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়েছে ।
অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান
ভঙ্গুর অর্থনীতিকে পুনর্গঠন করে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে বিএনপি । অর্থনীতির মূল পয়েন্টগুলো হলো:
স্মার্ট ইকোনমি: ঋণ-নির্ভরতার বদলে বিনিয়োগ-নির্ভর অর্থনীতি চালুর মাধ্যমে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে ।
কর্মসংস্থান: আগামী ৫ বছরে ১ কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে । বেকারদের জন্য ‘বেকারভাতা’ চালুর পাশাপাশি আইটি পার্কগুলোতে ফ্রি ওয়াইফাই ও ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে ।
রাজস্ব ও কর: আয়কর রিটার্নকে প্রাইভেট ডকুমেন্ট হিসেবে গণ্য করা হবে এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে ‘সিঙ্গেল-উইন্ডো ক্লিয়ারেন্স’ কার্যকর করা হবে ।
সামাজিক সুরক্ষা ও জনকল্যাণ
বিএনপি প্রতিটি পরিবারের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ এবং কৃষকদের জন্য ‘কৃষক কার্ড’ প্রদানের অঙ্গীকার করেছে ।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য: শিক্ষা ও স্বাস্থ্য উভয় খাতেই পর্যায়ক্রমে জিডিপির ৫% বরাদ্দ নিশ্চিত করার লক্ষ্য রাখা হয়েছে । নারী শিক্ষার্থীদের জন্য স্নাতকোত্তর পর্যন্ত শিক্ষা অবৈতনিক করা হবে ।
নারী ও শিশু: ধর্ষণের জন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং কর্মস্থলে ‘ডে-কেয়ার’ সেন্টার স্থাপন নিশ্চিত করা হবে ।
শ্রমিক ও প্রবাসী: মূল্যস্ফীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে প্রতি ২ বছর অন্তর মজুরি রিভিউ এবং প্রবাসীদের জন্য ‘ওয়েজ আর্নার্স গ্রীন সিটি’ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে ।
প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতি
পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি হবে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ এবং ‘বন্ধুত্ব সবার সাথে, কারো সাথে প্রভুত্ব নয়’ । জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সশস্ত্র বাহিনীকে ‘চতুর্মাত্রিক’ শক্তিতে রূপান্তর এবং একটি শক্তিশালী ‘জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল’ গঠন করা হবে । সীমান্তে হত্যা বন্ধ এবং অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতিও ইশতেহারে দেওয়া হয়েছে ।
পরিবেশ ও জ্বালানি
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ২০% বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ।
উপসংহার: বিএনপির এই নির্বাচনী ইশতেহার মূলত ফ্যাসিবাদের পুনরাবৃত্তি রোধ এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গঠনের রূপরেখা। প্রতিহিংসার রাজনীতির বিপরীতে ভবিষ্যৎমুখী এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি গঠনই দলটির মূল লক্ষ্য বলে ইশতেহারে দাবি করা হয়েছে ।
বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার ২০২৬ ডাউনলোড



