দাবির মুখে রাষ্ট্র: নতুন পে-স্কেলের দাবিতে উত্তাল রাজপথ
“পে-স্কেল শুধু বেতন নয়; এটি কর্মের মর্যাদা, জীবনের গৌরব এবং রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার।”—এই স্লোগানকে সামনে রেখে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের দাবিতে সোচ্চার হয়ে উঠেছেন সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের লাখো কর্মচারী। জীবনযাত্রার আকাশচুম্বী ব্যয়ের সাথে সংগতি রেখে বেতন কাঠামো পুনর্গঠন না করায় তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। আন্দোলনকারীদের মতে, অধিকার আদায়ে নীরব থাকা এখন আর সম্ভব নয়; দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এই ‘প্রতিবাদের আগুন’ নিভবে না।
১. জীবনযাত্রার ব্যয় ও বর্তমান প্রেক্ষাপট
বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে মুদ্রাস্ফীতি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে চরমসীমায় নিয়ে ঠেকিয়েছে। বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়:
-
নিত্যপণ্যের দাম: গত কয়েক বছরে চাল, ডাল, তেলসহ মৌলিক পণ্যের দাম বেড়েছে প্রায় ৪০% থেকে ৬০%।
-
আসল মজুরি হ্রাস: বেতন স্থির থাকায় এবং মুদ্রাস্ফীতি বাড়তে থাকায় কর্মচারীদের ‘প্রকৃত আয়’ বা ‘Real Wage’ হ্রাস পেয়েছে। একে আন্দোলনকারীরা ‘অপরাজেয় দরিদ্রতা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
২. কেন নতুন পে-স্কেল সময়ের দাবি?
আন্দোলনরত প্রতিনিধিরা তাদের বক্তব্যে কয়েকটি যৌক্তিক কারণ তুলে ধরেছেন:
-
মর্যাদা ও ন্যায়বিচার: শ্রমিকের ঘামের বিনিময়ে অর্জিত উন্নয়ন তখনই সার্থক হয় যখন সেই শ্রমের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা হয়। কর্মচারীদের মতে, বর্তমান বেতন কাঠামো তাদের সামাজিক মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করছে।
-
উন্নয়ন বনাম বঞ্চনা: রাষ্ট্র যখন বড় বড় অবকাঠামোগত উন্নয়নের কথা বলছে, তখন তৃণমূলের কর্মচারীরা ঋণের জালে জর্জরিত। তাদের মতে, মানুষের পেটে ক্ষুধা রেখে উন্নয়নের বুলি কেবলই ‘কণ্ঠস্বরের ফাঁদ’।
-
প্রতিষ্ঠান স্থবিরতার হুমকি: ক্ষোভ এতটাই দানা বেঁধেছে যে, কর্মচারীরা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন—দাবি পূরণ না হলে রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠানের চাকা থমকে যেতে পারে।
৩. কর্মচারীদের মূল দাবিসমূহ
আন্দোলনকারীদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে:
-
অবিলম্বে নবম পে-স্কেল ঘোষণা ও বাস্তবায়ন।
-
বেতন কাঠামোর বৈষম্য দূর করে ২০টি গ্রেডকে কমিয়ে একটি যৌক্তিক পর্যায়ে আনা।
-
অন্তর্র্বতীকালীন সময়ের জন্য অন্তত ২০% মহার্ঘ ভাতা প্রদান।
-
বাজার দরের সাথে সামঞ্জস্য রেখে চিকিৎসা ও বাড়ি ভাড়া ভাতা পুনর্নির্ধারণ।
“অধিকারকে পিছিয়ে রাখা মানে মানুষকে শৃঙ্খলিত করা। আমরা আর ক্লান্ত হবো না, বরং আমাদের এই দাবি আদায়ের লড়াই আরও তীব্র হবে।” — জনৈক আন্দোলনকারী সমন্বয়ক।
৪. বিশেষজ্ঞদের অভিমত
অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘ সময় পে-স্কেল না দেওয়ায় সরকারি চাকরিতে মেধাবীদের আকর্ষণ কমছে এবং নিম্নস্তরের কর্মচারীদের মধ্যে দুর্নীতির প্রবণতা বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। ন্যায়বিচার ভিত্তিক সমাজ গঠনে বেতন কাঠামোর সংস্কার অপরিহার্য।
রাষ্ট্রের চাকা সচল রাখতে এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি। ন্যায়ের অটল স্রোত ফিরিয়ে এনে কর্মচারীদের জীবনমান নিশ্চিত করা না হলে, এই অসন্তোষ বৃহত্তর গণআন্দোলনের রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
“১১ বছরের অপেক্ষা আর নয়, এবার হবে অধিকারের জয়।”—দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বেতন বৈষম্যের শিকার সরকারি কর্মচারীদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই যুগে জীবনধারণ যেখানে অসম্ভব হয়ে পড়েছে, সেখানে রাষ্ট্রের ‘ঘৃণ্য উদাসীনতা’র বিরুদ্ধে রাজপথে নামার চূড়ান্ত ঘোষণা দিয়েছেন তারা। তাদের সাফ কথা: “পে-স্কেল নয়তো নীরবতা নয়, দিতে হবে আজই!“
১. ‘উন্নয়নের কারিগর’ যখন দারিদ্র্যের শিকার
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, যারা দিনরাত পরিশ্রম করে রাষ্ট্রের চাকা সচল রাখছেন এবং দেশের উন্নয়ন নিশ্চিত করছেন, তাদেরকেই পরিকল্পিতভাবে দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। ২০১৫ সালের সর্বশেষ পে-স্কেলের পর দীর্ঘ ১১ বছর পেরিয়ে গেলেও নতুন কোনো বেতন কাঠামো ঘোষণা না করাকে তারা রাষ্ট্রের চরম ব্যর্থতা ও উদাসীনতা হিসেবে দেখছেন।
২. “অপেক্ষা”র শেষ সীমায় কর্মচারীরা
গত এক দশকে জীবনযাত্রার ব্যয় কয়েক গুণ বাড়লেও বেতন বাড়েনি আনুপাতিক হারে। আন্দোলনরত কর্মচারীরা বলছেন:
-
বাঁচতে না পারার দায়: সংসার চালাতে গিয়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়া এবং সন্তানদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে না পারার দায় সম্পূর্ণভাবে রাষ্ট্রের।
-
চুপ থাকার সময় শেষ: “আমরা আর অপেক্ষা করব না” – এই স্লোগান এখন প্রতিটি দপ্তরে দপ্তরে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
৩. রাজপথই শেষ গন্তব্য?
শান্তিপূর্ণ উপায়ে দাবি জানিয়ে কোনো ফল না আসায় এবার কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন:
“যদি আমাদের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া না হয়, তবে আমরা আর ঘরে বসে থাকব না। শান্ত থাকার দিন শেষ। রাজপথই এখন আমাদের দাবি আদায়ের একমাত্র পথ।”
৪. আন্দোলনের মূল বার্তা
-
তাৎক্ষণিক ঘোষণা: কোনো টালবাহানা নয়, আজই নতুন পে-স্কেল বা মহার্ঘ ভাতার সুনির্দিষ্ট ঘোষণা চাই।
-
মর্যাদার লড়াই: এটি কেবল টাকার লড়াই নয়, এটি শ্রমের মর্যাদা এবং বেঁচে থাকার অধিকার রক্ষার লড়াই।
-
প্রতিষ্ঠান অচল করার হুমকি: অধিকার আদায়ে প্রয়োজনে রাষ্ট্রের সকল দপ্তরের কাজ বন্ধ করে দেওয়ার মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নিতেও পিছপা হবেন না কর্মচারীরা।
উপসংহার: রাষ্ট্রের উদাসীনতা আজ সাধারণ কর্মচারীদের দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দিয়েছে। এই ক্ষোভের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছে। সরকার যদি অবিলম্বে যৌক্তিক দাবি মেনে না নেয়, তবে প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যন্ত এক নজিরবিহীন অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।


