এক সপ্তাহে সোনার দামে নজিরবিহীন নাটকীয়তা: ভরিপ্রতি ৩০ হাজার টাকা কমলো
দেশের বাজারে গত এক সপ্তাহ ধরে সোনার দামে যে অস্থিরতা চলছে, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে আগে কখনো দেখা যায়নি। বিশ্ববাজারে বড় ধরনের দরপতনের প্রভাবে মাত্র ৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানে স্থানীয় বাজারে সোনার দাম ভরিতে ৩০ হাজার টাকারও বেশি কমেছে। গত বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) যে সোনার দাম দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ২ লাখ ৮৬ হাজার টাকায় পৌঁছেছিল, শনিবারের দুই দফা সমন্বয় শেষে তা এখন ২ লাখ ৫৫ হাজার ৬১৭ টাকায় নেমে এসেছে।
কেন এই অস্থিরতা?
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দামে হঠাৎ ধস নামাই এর মূল কারণ। যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত এবং ফেডারেল রিজার্ভের সম্ভাব্য নীতি পরিবর্তনের খবরে বিশ্ববাজারে প্রতি আউন্স সোনার দাম ৫ হাজার ৫০০ ডলার থেকে নেমে ৪ হাজার ৮৯৩ ডলারে দাঁড়িয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের বাজারে।
বর্তমান বাজারমূল্য একনজরে (ভরি প্রতি)
বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)-এর সর্বশেষ নির্ধারিত মূল্য তালিকা অনুযায়ী:
| সোনার মান (ক্যারেট) | বর্তমান মূল্য (ভরি) | আগের দামের সাথে পার্থক্য |
| ২২ ক্যারেট | ২,৫৫,৬১৭ টাকা | ১৫,৭৪৬ টাকা (হ্রাস) |
| ২১ ক্যারেট | ২,৪৪,০১১ টাকা | ১৪,৯৮৮ টাকা (হ্রাস) |
| ১৮ ক্যারেট | ২,০৯,১৩৬ টাকা | ১২,৮৮৮ টাকা (হ্রাস) |
| সনাতন পদ্ধতি | ১,৭১,৮৬৯ টাকা | ১০,৯৬৪ টাকা (হ্রাস) |
দ্রষ্টব্য: জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানগুলো এই মূল্যের সাথে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ৫% ভ্যাট এবং বাজুস নির্ধারিত ন্যূনতম ৬% মজুরি যুক্ত করে বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ করবে।
গত এক সপ্তাহের ঘটনাপ্রবাহ
-
২৫ জানুয়ারি: ভরিতে ১,৫০০ টাকা বৃদ্ধি।
-
২৬ জানুয়ারি: ভরিতে ৫,২৪৯ টাকা বৃদ্ধি।
-
২৮ জানুয়ারি: এক লাফে ৭,৩৪৮ টাকা বৃদ্ধি।
-
২৯ জানুয়ারি: দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রেকর্ড গড়ে ভরি হয় ২ লাখ ৮৬ হাজার টাকা।
-
৩০ জানুয়ারি: প্রথম দফায় ১৪,৬৩৮ টাকা কমে।
-
৩১ জানুয়ারি: দ্বিতীয় দফায় আরও ১৫,৭৪৬ টাকা কমে আগের অবস্থায় ফিরে আসে।
বাজার পরিস্থিতি
টানা কয়েকদিন দাম বাড়ার পর হঠাৎ এই বড় পতনে ক্রেতাদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও যারা উচ্চমূল্যে সোনা কিনেছিলেন, তারা বড় লোকসানের মুখে পড়েছেন। তবে বাজুস জানিয়েছে, স্থানীয় বাজারে ‘তেজাবি সোনার’ দাম কমলে তারা দ্রুত দাম সমন্বয় করেন, যাতে সাধারণ ক্রেতারা ক্ষতিগ্রস্ত না হন।

স্বর্ণের বাজার এত অস্থির কেন?
স্বর্ণের বাজার বর্তমানে অনেকটা রোলার-কোস্টার রাইডের মতো কাজ করছে। এর পেছনের কারণগুলো যেমন বৈশ্বিক, তেমনি কিছু স্থানীয় প্রভাবও রয়েছে। মূলত যে ৪টি বড় কারণে এই অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে তা নিচে তুলে ধরা হলো:
১. ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা (Geopolitical Tension)
সারা বিশ্বে যখন যুদ্ধ বা অস্থিরতা (যেমন মধ্যপ্রাচ্য সংকট বা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ) দেখা দেয়, তখন বড় বিনিয়োগকারীরা টাকা বা শেয়ারের বদলে স্বর্ণকে সবচেয়ে নিরাপদ সম্পদ মনে করেন। একে বলা হয় ‘Safe Haven’। সবাই যখন একসাথে স্বর্ণ কিনতে শুরু করে, তখন চাহিদা বেড়ে গিয়ে দাম আকাশচুম্বী হয়। আবার রাজনৈতিক পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হওয়ার আভাস পেলে তারা স্বর্ণ বিক্রি করে দেয়, তখন দাম হু হু করে কমে।
২. মার্কিন ডলার ও ফেডারেল রিজার্ভের নীতি
আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণ কেনা-বেচা হয় ডলারে। মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক (Federal Reserve) যদি সুদের হার বাড়ায়, তখন ডলার শক্তিশালী হয় এবং স্বর্ণের দাম কমে। আর যদি তারা সুদের হার কমানোর ঘোষণা দেয়, তখন স্বর্ণের প্রতি মানুষের ঝোঁক বেড়ে যায়। সাম্প্রতিক সময়ে ডলারের মানের এই উঠানামাই স্বর্ণের বাজারে বড় অস্থিরতা তৈরি করেছে।
৩. স্থানীয় সরবরাহ ও ‘তেজাবি স্বর্ণ’ (Pure Gold)
বাংলাদেশে স্বর্ণের দাম সরাসরি বিশ্ববাজারের সাথে তাল মিলিয়ে চলে না। বাজুস (BAJUS) দাম নির্ধারণ করে স্থানীয় বাজারে পাকা সোনা বা ‘তেজাবি স্বর্ণের’ প্রাপ্যতার ওপর ভিত্তি করে। দেশে যদি স্বর্ণের সরবরাহ কমে যায় বা ব্যাগেজ রুলসের মাধ্যমে স্বর্ণ আসা কমে যায়, তখন আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়েও দেশে দাম দ্রুত বাড়তে থাকে।
৪. মনস্তাত্ত্বিক কারণ ও ফটকা বিনিয়োগ
যখন দাম বাড়তে শুরু করে, তখন অনেক সাধারণ মানুষ বা ফড়িয়া ব্যবসায়ীরা আরও বেশি লাভের আশায় সোনা মজুত করতে শুরু করে। এতে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়। আবার যখন দাম একটু পড়তে শুরু করে, তখন সবাই লোকসানের ভয়ে দ্রুত সোনা বিক্রি করে দিতে চায়, যা দামকে আরও নিচে নামিয়ে দেয়।
সংক্ষেপে: যুদ্ধের খবর, ডলারের দামের পরিবর্তন এবং স্থানীয় বাজারে সোনার কম সরবরাহ—এই তিনটির মিলিত প্রভাবেই আপনার দেখা সেই ৩০ হাজার টাকার ব্যবধান তৈরি হয়েছে।


