ভূমি সেবায় যুগান্তকারী পরিবর্তন ২০২৫ । এখন পাড়ার কম্পিউটার দোকান থেকেই নামজারির আবেদন!
বাংলাদেশ সরকার ভূমি খাতে স্বচ্ছতা ও গতিশীলতা আনতে ২০২৫ সাল থেকে নামজারি বা মিউটেশন কার্যক্রমে নতুন পদ্ধতি চালু করেছে। ল্যান্ড অটোমেশন প্রকল্পের আওতায় এই পরিবর্তনের ফলে নাগরিকদের এখন আর বারবার তহসিল অফিসে যেতে হবে না। এখন থেকে যেকোনো নিকটস্থ কম্পিউটার দোকান বা অনলাইন সেন্টারের মাধ্যমে সহজেই নামজারির জন্য আবেদন করা যাবে।
এটি ডিজিটাল বাংলাদেশের পথে ভূমি মন্ত্রণালয়ের একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ, যা নাগরিকদের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দিচ্ছে।
✅ নতুন নিয়মে নামজারি আবেদনের ধাপ ও প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট
আবেদন প্রক্রিয়া সহজ করতে সরকার নির্দিষ্ট কিছু ডকুমেন্ট জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করেছে। মোটকথা, নামজারি করাতে যা যা কাগজপত্র প্রয়োজন, সব নিয়ে এলাকার কোনো কম্পিউটার দোকান কিংবা অনলাইন সেন্টারে গেলেই আবেদন করা যাবে।
📄 আবেদনের জন্য আবশ্যক কাগজপত্র:
১. রেজিস্ট্রিকৃত বৈধ দলিল অথবা এর সার্টিফাইড কপি।
২. ওয়ারিশান/উত্তরাধিকার সনদ (যদি উত্তরাধিকার সূত্রে মালিকানা হয়)।
৩. জাতীয় পরিচয়পত্র (NID)।
৪. সক্রিয় মোবাইল নম্বর (যোগাযোগ এবং মেসেজ আদান-প্রদানের জন্য)।
৫. সর্বশেষ রেকর্ড (RS/BRS/BS খতিয়ান)।
৬. আবেদনকারীর পাসপোর্ট সাইজ ছবি।
৭. বিক্রেতার বায়া দলিলের কপি।
৮. খাজনা প্রদানের দাখিলা/রশিদ।
💰 সরকারি নির্ধারিত ফি’স (মোট ১,১৭০ টাকা):
| ফিসের ধরণ | পরিমাণ | সময়কাল |
| আবেদন ফি (কোর্ট ফি) | ২০ টাকা | আবেদনের সময় |
| নোটিশ জারি ফি | ৫০ টাকা | আবেদনের সময় |
| মোট আবেদনকালীন ফি | ৭০ টাকা | কম্পিউটার দোকানদার পরিশোধ করতে পারবেন |
| রেকর্ড সংশোধন বা হালকরণ ফি (ডিসিআর ফি) | ১,১০০ টাকা | শুনানির পর অনুমোদন হলে |
| মোট ফি | ১,১৭০ টাকা | – |
📝 ধাপে ধাপে নামজারি প্রক্রিয়া
১. অনলাইন আবেদন: প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং প্রথম ধাপের ৭০ টাকা ফি পরিশোধ করে নিকটস্থ অনলাইন সেন্টারের মাধ্যমে আবেদন করতে হবে। এই সময় প্রাপ্ত মেসেজগুলো সংরক্ষণ করতে হবে।
২. শুনানির জন্য উপস্থিতি: আবেদনের পর একটি নির্দিষ্ট তারিখে আপনার মোবাইলে শুনানির দিন ধার্য করে মেসেজ পাঠানো হবে। ওই তারিখে আবেদনকারীকে সকল মূল কাগজপত্র নিয়ে এসিল্যান্ড অফিসে (AC Land) হাজিরা দিতে হবে। কাগজপত্র সঠিক থাকলে মিউটেশন বা নামজারি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।
৩. ডিসিআর ফি পরিশোধ ও পর্চা ডাউনলোড: নামজারি সম্পন্ন হওয়ার পরে ডিসিআর কাটার জন্য মোবাইলে মেসেজ আসবে। এই ১,১০০ টাকা আপনি বিকাশ বা অন্য মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অথবা অনলাইন সেন্টারের মাধ্যমে পরিশোধ করতে পারবেন। ফি পরিশোধের পরেই উক্ত কম্পিউটার দোকান থেকে আপনার মিউটেশন বা নামজারি পর্চা ডাউনলোড করে নিতে পারবেন।
⏰ সেবার সময়সীমা ও করণীয়
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার নামজারি বা মিউটেশনের আবেদন এর দিন থেকে মাত্র ২৭ কার্য দিবসের মধ্যে সম্পন্ন করার আদেশ প্রদান করেছেন।
যদি এই কর্ম দিবসের মধ্যে আপনার নামজারি সম্পূর্ণ না হয়, তাহলে যেকোনো সমস্যার জন্য এলাকার এসিল্যান্ডের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এই ব্যবস্থা স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এবং নাগরিকদের দ্রুত সেবা দিতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
এই নতুন পদ্ধতি ভূমি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা এনে নাগরিকদের ভোগান্তি কমাতে এবং দ্রুততার সাথে মালিকানা স্বত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সহায়ক হবে।
অটোমেটিক নামজারি সত্যিই কি হবে?
অটোমেটিক নামজারি বা স্বয়ংক্রিয় মিউটেশন ব্যবস্থা সত্যিই বাস্তবায়নের পথে রয়েছে এবং এটি বাংলাদেশের ভূমি ব্যবস্থাপনায় একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে। তবে এটি পুরোপুরি চালু হওয়ার অর্থ এই নয় যে, রাতারাতি সব ধরণের নামজারি সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় হয়ে যাবে এবং মানুষকে একেবারেই কোনো কাজ করতে হবে না।
🔑 মূল তথ্য ও বর্তমান অবস্থা:
১. অটোমেটেড মিউটেশন সিস্টেম ২.১ চালু: ভূমি মন্ত্রণালয় সম্প্রতি দ্বিতীয় প্রজন্মের অটোমেটেড মিউটেশন সিস্টেম ২.১ চালু করেছে। এই নতুন সিস্টেমে ‘হিউম্যান টাচ’ (মানুষের হস্তক্ষেপ) আরও কমিয়ে আনা হয়েছে। এর ফলে দুর্নীতি ও হয়রানি কমার পাশাপাশি নামজারি প্রক্রিয়া আরও দ্রুত ও সহজ হবে।
২. দলিল রেজিস্ট্রির সাথে স্বয়ংক্রিয় নামজারি: সরকারের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো দলিল রেজিস্ট্রির (নিবন্ধনের) সঙ্গেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে নামজারি (মিউটেশন) সম্পন্ন করা। যখন কোনো জমি কেনাবেচা হবে, সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের সাথে এসিল্যান্ড অফিসের সমন্বয়ের মাধ্যমে সফটওয়্যার স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুরোনো মালিকের খতিয়ান থেকে জমি কর্তন করে নতুন মালিকের খতিয়ানে যুক্ত করবে।
-
এটি কার্যকর হলে ভবিষ্যতে আলাদা করে নামজারির আবেদন করার দরকার হবে না।
-
অনেক সংবাদ সূত্র অনুসারে, এই নতুন স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে ভূমি মালিকরা এর সুফল পাবেন এবং নামজারি সংক্রান্ত ভোগান্তি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে।
৩. পাইলটিং কার্যক্রম ও ‘ভূমি’ অ্যাপ:
-
স্বয়ংক্রিয় নামজারি ব্যবস্থা বর্তমানে পরীক্ষামূলকভাবে (পাইলটিং) দেশের কিছু উপজেলায় চালু রয়েছে। পুরো দেশে এটি পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
-
ভূমির নতুন ইন্টিগ্রেটেড মোবাইল অ্যাপ ‘ভূমি’ চালু করা হয়েছে। এই অ্যাপের মাধ্যমে নাগরিকরা ভূমি উন্নয়ন কর প্রদান, ডিসিআর ফি পরিশোধ, খতিয়ান সংগ্রহসহ বিভিন্ন কাজ ঘরে বসে করতে পারছেন।
⚠️ মনে রাখতে হবে:
-
যদিও প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয় হচ্ছে, তবুও জালিয়াতি রোধ এবং তথ্যের সঠিকতা যাচাইয়ের জন্য আবেদনকারীকে মাত্র একবার উপজেলা ভূমি অফিসে শুনানির জন্য যেতে হতে পারে, যেমনটি আপনার পূর্বের তথ্যটিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
-
ওয়ারিশ সূত্রে বা আদালতের ডিক্রি-সূত্রে প্রাপ্ত জমির নামজারির ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াটি কিছুটা ভিন্ন হতে পারে এবং সেখানে এখনও ওয়ারিশান সনদ বা বন্টননামা দলিলের প্রয়োজন হবে।
সংক্ষেপে: “অটোমেটিক নামজারি” একটি বাস্তব প্রক্রিয়া, যা ভূমি মন্ত্রণালয়ের ডিজিটাল উদ্যোগের অংশ। এটি বর্তমানে পরীক্ষামূলক পর্যায় পেরিয়ে পর্যায়ক্রমে দেশব্যাপী চালু হচ্ছে এবং এর চূড়ান্ত রূপ হবে দলিল রেজিস্ট্রির সাথে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নামজারি সম্পন্ন হওয়া।


