এইমাত্র পাওয়া

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা: ২১ জানুয়ারি শুরু, ২৭ মে শেষ হবে পাঁচ ধাপের ভোট

বাংলাদেশে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন আয়োজনের রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ঘোষিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ সালের ২১ জানুয়ারি প্রথম ধাপের ভোটগ্রহণের মধ্য দিয়ে শুরু হবে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন। এরপর পর্যায়ক্রমে ৪ ফেব্রুয়ারি, ২৯ এপ্রিল, ১৩ মে এবং ২৭ মে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। সব মিলিয়ে পাঁচ ধাপে এই নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

সোমবার (১২ অক্টোবর ২০২৬) নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এই রোডম্যাপ ঘোষণা করেন নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ। এর আগে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনের সভাপতিত্বে নির্বাচন ভবনে কমিশনের সভা অনুষ্ঠিত হয়।

নির্বাচন কমিশনের এই ঘোষণার ফলে স্থানীয় সরকার পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন নিয়ে সম্ভাব্য সময়সূচি স্পষ্ট হয়েছে। তবে ভোটের দিন নির্ধারণের পাশাপাশি নির্বাচনী তফসিল, প্রার্থী হওয়ার প্রক্রিয়া, মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই এবং নির্বাচনী আচরণবিধি অনুসরণের বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের পাঁচ ধাপের তারিখ একনজরে

প্রথম ধাপ

২১ জানুয়ারি ২০২৭

বৃহস্পতিবার

দ্বিতীয় ধাপ

৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৭

বৃহস্পতিবার

তৃতীয় ধাপ

২৯ এপ্রিল ২০২৭

বৃহস্পতিবার

চতুর্থ ধাপ

১৩ মে ২০২৭

বৃহস্পতিবার

পঞ্চম ও শেষ ধাপ

২৭ মে ২০২৭

বৃহস্পতিবার

সূত্র: নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত রোডম্যাপের সংবাদ প্রতিবেদন।

কেন পাঁচ ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন?

ইউনিয়ন পরিষদ দেশের গ্রামীণ স্থানীয় সরকারব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। জন্মনিবন্ধন, নাগরিক সনদ, স্থানীয় অবকাঠামো উন্নয়ন, গ্রামীণ সড়ক, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বিভিন্ন কার্যক্রমসহ নাগরিক সেবার নানা ক্ষেত্রে ইউনিয়ন পরিষদের ভূমিকা রয়েছে।

দেশের বিপুলসংখ্যক ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন একসঙ্গে আয়োজন করার পরিবর্তে কয়েকটি ধাপে ভোটগ্রহণের পরিকল্পনা নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। এর মাধ্যমে নির্বাচনী কার্যক্রম পর্যায়ক্রমে পরিচালনা, প্রশাসনিক প্রস্তুতি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব বণ্টন সহজ করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

এর আগে নির্বাচন কমিশনের পরিকল্পনা নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছিল, দেশের বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনযোগ্যতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরীক্ষা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যস্ততা বিবেচনায় নিয়ে ভোটের সময় নির্ধারণের কাজ চলছিল। পরবর্তী সময়ে নভেম্বর ও ডিসেম্বরের পরিবর্তে ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে নির্বাচন শুরু করার পরিকল্পনা সামনে আসে।

কোন ধাপে কতটি ইউনিয়ন পরিষদে ভোট হবে?

নির্বাচন কমিশনের রোডম্যাপ ঘোষণার আগে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে সম্ভাব্য ধাপভিত্তিক ইউনিয়ন পরিষদের সংখ্যা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। সেখানে প্রথম ধাপে ৮১৫টি, দ্বিতীয় ধাপে ৭২৭টি, তৃতীয় ধাপে ৭৯০টি এবং চতুর্থ ধাপে ৯৫১টি ইউনিয়ন পরিষদে ভোটের সম্ভাব্য হিসাব তুলে ধরা হয়।

তবে এসব সংখ্যা প্রাথমিক পরিকল্পনাসংক্রান্ত প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্য। চূড়ান্তভাবে কোন ধাপে কোন ইউনিয়ন পরিষদে ভোট হবে, তা নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত আনুষ্ঠানিক তফসিল ও সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞপ্তি অনুসরণ করতে হবে।

বিশেষ করে তৃতীয় ধাপের ভোটের তারিখ নিয়ে প্রাথমিক প্রতিবেদনে ২ মে উল্লেখ করা হলেও পরবর্তী রোডম্যাপ ঘোষণার সংবাদে ২৯ এপ্রিলের কথা বলা হয়েছে। তাই সর্বশেষ ঘোষিত তারিখ হিসেবে ২৯ এপ্রিল ২০২৭-ই এই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

কবে ঘোষণা করা হবে নির্বাচনী তফসিল?

রোডম্যাপ ঘোষণা এবং আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী তফসিল প্রকাশ এক বিষয় নয়। রোডম্যাপে মূলত কোন সময়ে কোন ধাপে ভোটগ্রহণ হবে, তার পরিকল্পনা জানানো হয়। অন্যদিকে আনুষ্ঠানিক তফসিলে মনোনয়নপত্র জমা, যাচাই-বাছাই, প্রার্থিতা প্রত্যাহার এবং ভোটগ্রহণের নির্ধারিত তারিখসহ প্রয়োজনীয় তথ্য প্রকাশ করা হয়।

নির্বাচন কমিশনের পরিকল্পনা নিয়ে দ্য ডেইলি স্টার-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, সাধারণভাবে ভোটগ্রহণের ৩২ থেকে ৩৫ দিন আগে সংশ্লিষ্ট ধাপের নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে নির্দিষ্ট ধাপের চূড়ান্ত তফসিল প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত মনোনয়নপত্র জমা বা যাচাই-বাছাইয়ের তারিখ নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না।

এ কারণে সম্ভাব্য প্রার্থী, রাজনৈতিক দল এবং স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে অংশ নিতে আগ্রহীদের নির্বাচন কমিশনের পরবর্তী বিজ্ঞপ্তির দিকে নজর রাখতে হবে।

প্রার্থীদের জন্য যেসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান, সাধারণ ওয়ার্ডের সদস্য এবং সংরক্ষিত নারী ওয়ার্ডের সদস্য পদে আগ্রহীদের নির্বাচনী প্রস্তুতির পাশাপাশি আইনগত যোগ্যতা ও আচরণবিধি সম্পর্কে ধারণা রাখা প্রয়োজন।

প্রার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিষয় হলো:

  • যোগ্যতা যাচাই: সংশ্লিষ্ট পদে প্রার্থী হওয়ার আইনগত শর্ত পূরণ হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করা।

  • মনোনয়নপত্র প্রস্তুতি: নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও তথ্য প্রস্তুত রাখা।

  • তফসিল অনুসরণ: মনোনয়নপত্র জমা, যাচাই-বাছাই এবং প্রত্যাহারের নির্ধারিত সময়সীমা মেনে চলা।

  • আচরণবিধি মানা: প্রচার-প্রচারণা, সভা-সমাবেশ এবং নির্বাচনী কার্যক্রমে প্রযোজ্য বিধিমালা অনুসরণ করা।

  • সরকারি বিজ্ঞপ্তি দেখা: গুজব বা অনানুষ্ঠানিক তথ্যের পরিবর্তে নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া।

উল্লেখ্য, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের আচরণবিধি ও নির্বাচনবিধি হালনাগাদ করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনসংক্রান্ত বিধিমালা ও গেজেট পাওয়া যায়।

নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি

নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ রোডম্যাপ ঘোষণার সময় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে বৈঠকের কথা জানিয়েছেন। একই সঙ্গে সহিংসতামুক্ত নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে সংবাদ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, প্রার্থীদের প্রচারণা এবং ভোটকেন্দ্রের ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই নির্বাচনের আগে নিরাপত্তা পরিকল্পনা, ভোটকেন্দ্র নির্ধারণ, নির্বাচনী কর্মকর্তা নিয়োগ এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করা জরুরি।

নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে আয়োজন করা গেলে ভোটারদের অংশগ্রহণ এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের প্রক্রিয়া নির্বিঘ্ন রাখার সুযোগ বাড়বে। তবে বাস্তব পরিস্থিতি নির্ভর করবে মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং নির্বাচন কমিশনের গৃহীত ব্যবস্থার ওপর।

ভোটারদের কী প্রস্তুতি নেওয়া উচিত?

ভোটারদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিজের ভোটার-তথ্য সঠিক আছে কি না, তা যাচাই করা এবং সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনী তফসিল সম্পর্কে অবগত থাকা।

ভোটাররা নির্বাচন কমিশনের আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তি থেকে নিজেদের এলাকার ভোটের তারিখ, ভোটকেন্দ্র এবং ভোটার তালিকাসংক্রান্ত তথ্য জানতে পারবেন। কোনো এলাকায় ভোট স্থগিত, পুনর্নির্ধারণ বা অন্য কোনো পরিবর্তন হলে সে বিষয়ে কমিশনের পরবর্তী ঘোষণাই অনুসরণ করা উচিত।

একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত অযাচাইকৃত তারিখ বা প্রার্থীদের সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর তথ্যের বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

শেষ কথা

২০২৭ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে পাঁচ ধাপের রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। ঘোষিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ধাপের ভোট ২১ জানুয়ারি এবং পঞ্চম ও শেষ ধাপের ভোট ২৭ মে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। মাঝের তিনটি ধাপের তারিখ যথাক্রমে ৪ ফেব্রুয়ারি, ২৯ এপ্রিল ও ১৩ মে।

এখন নির্বাচনী কার্যক্রমের পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদগুলোর নির্বাচনযোগ্যতা নির্ধারণ, ধাপভিত্তিক এলাকা চূড়ান্ত করা এবং আনুষ্ঠানিক তফসিল ঘোষণা। তাই প্রার্থী ও ভোটার—উভয়েরই উচিত নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ নির্দেশনা অনুসরণ করা।

তথ্যসূত্র: নির্বাচন কমিশনের রোডম্যাপ ঘোষণা নিয়ে প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদন এবং বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *