নতুন পে-স্কেলে ভাতায় বড় পরিবর্তন, চিকিৎসা-টিফিন-যাতায়াতে বাড়ছে সুবিধা
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বহুল প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় পে-স্কেল ২০২৬ নিয়ে ভাতা কাঠামোতেও বড় ধরনের পরিবর্তনের তথ্য সামনে এসেছে। মূল বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি চিকিৎসা, টিফিন, যাতায়াতসহ বিভিন্ন নিয়মিত ভাতা পুনর্নির্ধারণের বিষয়টি এখন সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—৩১ আগস্ট মন্ত্রিসভা নবম জাতীয় পে-স্কেল অনুমোদন করলেও ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এর চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশের প্রক্রিয়া শেষ হয়নি। সর্বশেষ খবরে জানা গেছে, প্রজ্ঞাপনের খসড়া রেজল্যুশন বিজি প্রেস হয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে ফেরার পর আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং পর্যায়ে রয়েছে।
ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত ভাতার তালিকাকে চূড়ান্ত গেজেটের পরিবর্তে অনুমোদিত কাঠামো/প্রস্তাব হিসেবে দেখা নিরাপদ, যতক্ষণ না সরকারি প্রজ্ঞাপনে নির্দিষ্ট হার প্রকাশিত হচ্ছে।
যেসব ভাতায় পরিবর্তনের তথ্য সামনে এসেছে
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নতুন কাঠামোয় কয়েকটি ভাতা আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর কথা বলা হচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হচ্ছে চিকিৎসা, টিফিন ও যাতায়াত ভাতা। একটি সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে প্রস্তাবিত চিত্র হিসেবে চিকিৎসা ভাতা ১,৫০০ টাকা থেকে ৩,০০০ টাকা, টিফিন ভাতা ৫০০ টাকা এবং যাতায়াত ভাতা ৬০০ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে।
১. চিকিৎসা ভাতা: ১,৫০০ থেকে ৩,০০০ টাকা
বর্তমান কাঠামোয় মাসিক চিকিৎসা ভাতা ১,৫০০ টাকা। নতুন কাঠামোয় এটি ৩,০০০ টাকা করার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
অর্থাৎ একজন কর্মচারীর মাসিক চিকিৎসা ভাতা বাড়বে ১,৫০০ টাকা। বছরে হিসাব করলে শুধু এই খাতেই অতিরিক্ত প্রাপ্য দাঁড়াবে ১৮,০০০ টাকা।
মূল্যস্ফীতি, ওষুধের দাম বৃদ্ধি এবং চিকিৎসা পরীক্ষার ব্যয় বিবেচনায় এটি সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হতে পারে।
২. টিফিন ভাতা: ২০০ থেকে ৫০০ টাকা
নতুন পে-স্কেলের আলোচিত পরিবর্তনের মধ্যে রয়েছে টিফিন ভাতা।
বর্তমানে ২০০ টাকা টিফিন ভাতা পাওয়া গেলেও প্রস্তাবিত কাঠামোয় তা ৫০০ টাকা করার তথ্য রয়েছে। অর্থাৎ মাসে বাড়তি ৩০০ টাকা এবং বছরে ৩,৬০০ টাকা বেশি পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
৩. যাতায়াত ভাতা: ৩০০ থেকে ৬০০ টাকা
যাতায়াত ভাতাতেও দ্বিগুণ বৃদ্ধির তথ্য সামনে এসেছে। প্রস্তাবিত হিসাবে বর্তমান ৩০০ টাকা থেকে ৬০০ টাকা করা হলে মাসিক বাড়তি সুবিধা হবে ৩০০ টাকা।
অর্থাৎ বছরে এ খাতে একজন কর্মচারীর অতিরিক্ত প্রাপ্য হতে পারে ৩,৬০০ টাকা।
বর্তমান সময়ে গণপরিবহন, রিকশা, অটোরিকশা ও অন্যান্য যাতায়াত ব্যয়ের সঙ্গে তুলনা করলে এই বৃদ্ধিকে অনেক কর্মচারী স্বস্তিদায়ক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।
৪. শিক্ষা সহায়তা ভাতা: অপরিবর্তিত থাকার তথ্য
এখানেই নতুন পে-স্কেল নিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
প্রকাশিত প্রস্তাবিত তালিকায় শিক্ষা সহায়তা ভাতা আগের মতোই ৫০০ টাকা, সর্বোচ্চ দুই সন্তানের জন্য রাখার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ এ খাতে কোনো বাড়তি সুবিধা রাখা হয়নি বলে ওই তালিকায় উল্লেখ রয়েছে।
এ নিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষও তৈরি হয়েছে। আজ ৯ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতি নবম পে-স্কেলে বাড়িভাড়ার পাশাপাশি শিক্ষা ভাতা বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছে।
কারণ গত কয়েক বছরে স্কুলের বেতন, বই-খাতা, পোশাক, পরিবহন ও অন্যান্য শিক্ষা ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে ৫০০ টাকা শিক্ষা সহায়তা ভাতা বর্তমান ব্যয়ের তুলনায় কতটা কার্যকর—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
৫. উৎসব ভাতা: মূল বেতনের ১০০ শতাংশ
প্রচারিত তথ্য অনুযায়ী, নতুন কাঠামোয় উৎসব ভাতা মূল বেতনের ১০০ শতাংশ রাখার কথা বলা হচ্ছে।
এটি বাস্তবায়িত হলে উৎসব ভাতার পরিমাণ সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর নতুন মূল বেতনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত হবে। ফলে নতুন পে-স্কেলে মূল বেতন বৃদ্ধির কারণে উৎসব ভাতার অঙ্কও স্বাভাবিকভাবেই বাড়বে।
৬. বাংলা নববর্ষ ভাতা নিয়ে সতর্কতা জরুরি
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ অসঙ্গতি রয়েছে।
ব্যবহারকারীদের মধ্যে প্রচারিত একটি তালিকায় বাংলা নববর্ষ ভাতা ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক আরেকটি পে-স্কেল বিশ্লেষণে ৫ শতাংশ প্রস্তাবিত হার উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ নববর্ষ ভাতার ক্ষেত্রে এখনই ১৫ শতাংশকে চূড়ান্ত ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশের পরই নির্ভুল হার নিশ্চিত হওয়া যাবে।
২০১৫ সালের অষ্টম জাতীয় পে-স্কেলে বাংলা নববর্ষ ভাতা চালু হয়েছিল এবং সেটি ছিল মূল বেতনের ২০ শতাংশ।
৭. মোবাইল ভাতায়ও নতুন সুবিধার আলোচনা
নতুন কাঠামোয় মোবাইল ভাতার আওতা বাড়ানোর তথ্যও সামনে এসেছে। প্রকাশিত বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ১ম থেকে ৫ম গ্রেডে ৫০০ টাকা এবং ৬ষ্ঠ থেকে ২০তম গ্রেডে ১৫০ টাকা মোবাইল ভাতার কথা বলা হয়েছে।
এটি কার্যকর হলে নিম্নগ্রেডের কর্মচারীরাও মোবাইল যোগাযোগের জন্য নির্দিষ্ট ভাতা পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
৮. বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য নতুন সুবিধা
আরও একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য ভাতা। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রতি সন্তানের জন্য মাসে ৩,০০০ টাকা ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
এ ধরনের সুবিধা কার্যকর হলে চিকিৎসা, থেরাপি, বিশেষ শিক্ষা ও পরিচর্যার অতিরিক্ত ব্যয় বহনকারী পরিবারগুলো সরাসরি উপকৃত হবে।
এক নজরে আলোচিত ভাতার পরিবর্তন
| ভাতার নাম | বর্তমান | আলোচিত নতুন হার | পরিবর্তন |
|---|---|---|---|
| চিকিৎসা ভাতা | ১,৫০০ টাকা | ৩,০০০ টাকা | +১,৫০০ |
| টিফিন ভাতা | ২০০ টাকা | ৫০০ টাকা | +৩০০ |
| যাতায়াত ভাতা | ৩০০ টাকা | ৬০০ টাকা | +৩০০ |
| শিক্ষা সহায়তা | ৫০০ টাকা | ৫০০ টাকা | অপরিবর্তিত |
| উৎসব ভাতা | মূল বেতনের ভিত্তিতে | ১০০% মূল বেতন | পরিবর্তন/নতুন কাঠামো |
| নববর্ষ ভাতা | ২০% | হার নিয়ে ভিন্ন তথ্য | গেজেটের অপেক্ষা |
| মোবাইল ভাতা | সীমিত | ৫০০/১৫০ টাকা | আওতা বাড়ার তথ্য |
উপরের অঙ্কগুলোতে বিশেষ করে নববর্ষ ভাতা ও অন্যান্য শর্তের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সরকারি গেজেটকে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। কারণ ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গেজেট প্রকাশের প্রক্রিয়া চলমান।
মূল বেতনের পাশাপাশি প্রকৃত আয় কতটা বাড়বে?
নবম পে-স্কেলে মূল বেতনেও বড় পরিবর্তন অনুমোদন করা হয়েছে। বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণের সিদ্ধান্ত হয়েছে। নতুন কাঠামো ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে।
তবে একজন কর্মচারীর হাতে প্রকৃতপক্ষে কত টাকা বাড়বে, সেটি শুধু নতুন মূল বেতন দেখে নির্ধারণ করা যাবে না। এর সঙ্গে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াত, টিফিন, শিক্ষা, মোবাইল, উৎসব ও অন্যান্য প্রাপ্য যোগ করে মোট গ্রস বেতন হিসাব করতে হবে।
এ কারণেই নতুন পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশের পর প্রতিটি গ্রেডের জন্য পুরোনো বনাম নতুন মূল বেতন + সব ভাতা + মোট বেতন আলাদাভাবে হিসাব করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে।
গেজেটই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
সব মিলিয়ে নবম পে-স্কেলের ভাতা কাঠামোয় চিকিৎসা, টিফিন ও যাতায়াত ভাতায় ইতিবাচক পরিবর্তনের তথ্য সামনে এসেছে। অন্যদিকে শিক্ষা ভাতা অপরিবর্তিত থাকার বিষয়টি সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি করেছে এবং ইতোমধ্যে তা বাড়ানোর দাবিও উঠেছে।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কোনো তালিকাকে সরাসরি চূড়ান্ত সরকারি প্রজ্ঞাপন হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়। কারণ সর্বশেষ তথ্যে গেজেটের খসড়া এখনো আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং পর্যায়ে রয়েছে।
সুতরাং, সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অপেক্ষা হলো চূড়ান্ত গেজেট। গেজেট প্রকাশ হলেই কোন ভাতা কত টাকা, কোন গ্রেডে কত প্রযোজ্য এবং কোন তারিখ থেকে কোন সুবিধা কার্যকর হবে—এসব বিষয়ে আর কোনো বিভ্রান্তি থাকবে না।


