১ জুলাই থেকে পে-স্কেল বাস্তবায়নের ঘোষণা, এবার প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের বার্তায় নতুন আশার আলো
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বহুল প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় পে-স্কেল নিয়ে নতুন করে আশার আলো দেখা দিয়েছে। বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, ১ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করা হবে। আর আজ ১৬ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার জানিয়েছেন, চলতি অর্থবছরেই নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন করা হবে এবং এটি যেকোনো সময় ঘোষণা হতে পারে।
এই দুই বক্তব্যকে পাশাপাশি রাখলে একটি বিষয় স্পষ্ট—নবম পে-স্কেল বাস্তবায়ন এখন আর শুধু দীর্ঘমেয়াদি আলোচনা বা দাবির পর্যায়ে নেই; বরং সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া এখন শেষ পর্যায়ের দিকে এগিয়েছে। তবে চূড়ান্ত গেজেট, অনুমোদিত কাঠামো এবং নির্দিষ্ট কার্যকরী আদেশ প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট বেতনহার বা বাস্তবায়নের তারিখকে চূড়ান্ত ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যে ১ জুলাইয়ের বিষয়টি কী ছিল?
নতুন অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী উল্লেখ করেছিলেন, সরকারি কর্মচারীরা দীর্ঘ সময় ধরে একই বেতন কাঠামোর মধ্যে রয়েছেন এবং মূল্যস্ফীতির কারণে তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে ১ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের পরিকল্পনার কথা জানানো হয়।
অর্থাৎ ১ জুলাইকে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার সূচনা হিসেবে উল্লেখ করা হলেও, এর অর্থ এই নয় যে ওই দিনই নতুন বেতন কাঠামোর পূর্ণাঙ্গ গেজেট প্রকাশ হয়ে সবাই নতুন বেতন হাতে পেয়েছেন। বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক অনুমোদন, প্রজ্ঞাপন/গেজেট, অর্থ বরাদ্দ, হিসাব ব্যবস্থার পরিবর্তন এবং সংশ্লিষ্ট সফটওয়্যারে প্রয়োজনীয় সমন্বয়সহ একাধিক ধাপ থাকতে পারে।
আজকের বক্তব্যে কেন নতুন গুরুত্ব তৈরি হয়েছে?
১৬ আগস্ট সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার বলেন, নতুন বেতন কাঠামো চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং যেকোনো সময় ঘোষণা হতে পারে। একই সঙ্গে তিনি জানান, সরকারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী চলতি অর্থবছরেই পে-স্কেল বাস্তবায়ন করা হবে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে—মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বাধীন সচিব কমিটি পে-স্কেলের প্রস্তাবটি নীতিগতভাবে চূড়ান্ত করেছে এবং প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি সাপেক্ষে এটি মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের প্রস্তুতি রয়েছে।
এ কারণে বর্তমান পরিস্থিতিকে আগের অনিশ্চয়তার সঙ্গে এক করে দেখার সুযোগ কমে এসেছে। এখন মূল প্রশ্ন “পে-স্কেল হবে কি হবে না”—এর চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে “কখন চূড়ান্ত অনুমোদন ও ঘোষণা আসবে এবং কীভাবে বাস্তবায়ন হবে”।
সম্ভাব্য বেতন বৃদ্ধির বিষয়েও আলোচনা
সচিব কমিটির নীতিগতভাবে চূড়ান্ত করা প্রস্তাব নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বেতন বৃদ্ধির সম্ভাব্য কাঠামো সম্পর্কে তথ্য এসেছে। একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত কাঠামোয় সরকারি কর্মচারীদের মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ রয়েছে। একই সঙ্গে উচ্চ গ্রেডের তুলনায় নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন আনুপাতিকভাবে বেশি বাড়ানোর মতও উঠে এসেছে।
তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা হলো—এসব সংখ্যা এখনো চূড়ান্ত সরকারি গেজেট হিসেবে প্রকাশিত হয়নি। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত নির্দিষ্ট গ্রেডভিত্তিক বেতন, ভাতা কিংবা নতুন স্কেলের টেবিলকে সরকারি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে ধরে নেওয়া উচিত নয়।
প্রায় ১৮ লাখ সরকারি কর্মচারীর প্রত্যাশা
প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের বক্তব্য অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় নতুন পে-স্কেল না থাকায় প্রায় ১৮ লাখ সরকারি কর্মচারী এর প্রভাবের মধ্যে রয়েছেন। মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে বিদ্যমান বেতন কাঠামোর সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও তিনি তুলে ধরেছেন।
২০১৫ সালে অষ্টম জাতীয় পে-স্কেল কার্যকর হওয়ার পর দীর্ঘ সময় নতুন বেতন কাঠামো না আসায় সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে এ নিয়ে প্রত্যাশা ক্রমেই বেড়েছে। ফলে নতুন পে-স্কেলের ঘোষণা শুধু বেতন বৃদ্ধির বিষয় নয়; এটি সরকারি কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের আর্থিক প্রত্যাশা, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং মূল্যস্ফীতির সঙ্গে বেতন কাঠামোর সমন্বয়ের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।
“পে-স্কেল হবে না”—এ ধরনের দাবির বিষয়ে বাস্তবতা কী?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পে-স্কেল হবে না, আবার হবে—এমন বিপরীতমুখী বক্তব্য নিয়মিত ছড়াচ্ছে। কিন্তু বর্তমানে প্রকাশ্যে আসা সরকারি পর্যায়ের বক্তব্যগুলো বিশ্লেষণ করলে “পে-স্কেল হবে না” এমন দাবির পক্ষে কোনো শক্ত সরকারি বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে না।
বরং সর্বশেষ বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব সরাসরি বলেছেন, চলতি অর্থবছরেই নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন করা হবে এবং যেকোনো সময় ঘোষণা আসতে পারে।
তাই যাচাই না করে নেতিবাচক গুজব ছড়ানো যেমন বিভ্রান্তিকর, তেমনি চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশের আগেই নির্দিষ্ট বেতনহার বা শতভাগ নিশ্চিত বাস্তবায়নের তারিখ ঘোষণা করাও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এখন সামনে কী হতে পারে?
বর্তমান তথ্য অনুযায়ী সম্ভাব্য প্রক্রিয়াটি হতে পারে—
সচিব কমিটির চূড়ান্ত প্রস্তাব → প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি → মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন → অনুমোদন → প্রজ্ঞাপন/গেজেট → প্রশাসনিক ও আর্থিক বাস্তবায়ন।
প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের বক্তব্যে যেহেতু বলা হয়েছে পে-স্কেল চূড়ান্ত পর্যায়ে এবং যেকোনো সময় ঘোষণা হতে পারে, তাই পরবর্তী কয়েকটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
গুজব নয়, এখন দরকার সরকারি ঘোষণার অপেক্ষা
নবম পে-স্কেল নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের দাবি, পাল্টা দাবি ও গুজব ছড়িয়েছে। কিন্তু আজকের বক্তব্য পরিস্থিতিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। একদিকে বাজেট বক্তৃতায় ১ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা জানানো হয়েছে, অন্যদিকে ১৬ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব জানিয়েছেন, চলতি অর্থবছরেই এটি বাস্তবায়ন হবে এবং ঘোষণা যেকোনো সময় আসতে পারে।
অতএব, এখন সবচেয়ে দায়িত্বশীল অবস্থান হলো—পে-স্কেল হবে কি না, সেই বিতর্কের চেয়ে চূড়ান্ত সরকারি ঘোষণা কখন আসে এবং অনুমোদিত কাঠামো কী হয়, সেটির দিকে নজর রাখা।
সরকারি কর্মচারীদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার এই সময়ে গুজব বা অনুমান দিয়ে বিভ্রান্তি না ছড়িয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রজ্ঞাপন, গেজেট ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের বক্তব্যের ভিত্তিতেই তথ্য প্রচার করা প্রয়োজন। কারণ পে-স্কেলের মতো প্রায় ১৮ লাখ সরকারি কর্মচারীর বেতন-ভাতাকে প্রভাবিত করা একটি বড় সিদ্ধান্তে একটি ভুল তথ্যও ব্যাপক বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে।
সর্বশেষ সরকারি পর্যায়ের বক্তব্যের সারকথা একটাই—নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের সিদ্ধান্তের দিকে সরকার এগোচ্ছে; এটি চলতি অর্থবছরেই বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে এবং ঘোষণা যেকোনো সময় আসতে পারে। এখন অপেক্ষা শুধু চূড়ান্ত অনুমোদন ও আনুষ্ঠানিক ঘোষণার।


