১৮ মাসে ড. ইউনূসের সরকার: অর্জন, বিতর্ক ও একজন নাগরিকের ব্যক্তিগত মূল্যায়ন
রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ছাড়াই একটি অস্থির ও সংকটপূর্ণ সময়ে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নিয়েছিলেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট তিনি প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেন। প্রায় ১৮ মাস দায়িত্ব পালনের পর ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি নতুন নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটে।
এই সময়কে ঘিরে বাংলাদেশের মানুষের মূল্যায়ন একেবারেই একরকম নয়। কারও কাছে এটি ছিল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কার ও রাজনৈতিক পরিসর উন্মুক্ত করার সময়, আবার কারও কাছে আইনশৃঙ্খলা, দ্রব্যমূল্য ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এটি ছিল হতাশার অধ্যায়। তবে সমর্থকদের একটি অংশ মনে করেন, কঠিন পরিস্থিতিতে দায়িত্ব নেওয়া একজন অরাজনৈতিক ব্যক্তির কিছু কর্মকাণ্ড ভবিষ্যতে আলাদাভাবে মূল্যায়িত হবে।
রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ছাড়াই রাষ্ট্র পরিচালনার কঠিন দায়িত্ব
ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রচলিত অর্থে কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা ছিলেন না। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার একটি অস্বাভাবিক ও সংকটপূর্ণ পরিস্থিতিতে তাঁকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা করা হয়।
তখন দেশের প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা ও অর্থনীতি—সব ক্ষেত্রেই বড় ধরনের চাপ ছিল। ফলে তাঁর সরকারের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সচল রাখা, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করা।
Freedom House-এর ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার রাজনৈতিক ও নাগরিক পরিসর কিছুটা উন্মুক্ত করে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। একই প্রতিবেদনে অবশ্য সহিংসতা ও রাজনৈতিক প্রতিশোধের ঘটনাও অব্যাহত থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
রিজার্ভ পুনর্গঠনে দৃশ্যমান অগ্রগতি
ইউনূস সরকারের সময় অর্থনীতির অন্যতম আলোচিত বিষয় ছিল বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্টে দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল প্রায় ২৫.৫৮ বিলিয়ন ডলার। ২০২৫ সালের আগস্টে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৩১.১৭ বিলিয়ন ডলারে এবং ২০২৬ সালের জুনে মোট রিজার্ভ প্রায় ৩৭.৫৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে।
তবে শুধু সরকারের একক কৃতিত্ব হিসেবে রিজার্ভ বৃদ্ধিকে দেখাও পুরোপুরি সঠিক হবে না। বিশ্বব্যাংক বলেছে, রেমিট্যান্স বৃদ্ধি, শক্তিশালী রপ্তানি এবং চলতি হিসাবের উন্নতিও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পুনর্গঠনে ভূমিকা রেখেছে।
অর্থাৎ, রিজার্ভ বৃদ্ধির বিষয়টি ইউনূস সরকারের একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন হলেও এর পেছনে একাধিক অর্থনৈতিক কারণ কাজ করেছে।
মূল্যস্ফীতি ও দ্রব্যমূল্য: সবচেয়ে বড় বিতর্ক
সমর্থকদের দাবি, সরকারের কিছু সময় বাজার ব্যবস্থাপনা ও জ্বালানি দামের সমন্বয়ের কারণে সাধারণ মানুষ স্বস্তি পেয়েছিল। ২০২৪ সালের আগস্টের পর জ্বালানি তেলের দামও কয়েক দফা কমানো হয়েছিল। যেমন, সেপ্টেম্বর ২০২৪-এ ডিজেল ও কেরোসিনের দাম কমে ১০৫.৫০ টাকা এবং পেট্রোল ও অকটেনের দাম যথাক্রমে ১২১ ও ১২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়।
তবে পুরো ১৮ মাসকে ‘দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের সাফল্য’ বলা কঠিন। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ২০২৬ সালের মূল্যায়নে দেখা যায়, বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি উচ্চই ছিল। FY2025-এ গড় CPI inflation ছিল প্রায় ১০ শতাংশ এবং অক্টোবর ২০২৫-এ বছরওয়ারি মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.২ শতাংশ।
অর্থাৎ, কিছু পণ্যের দাম বা জ্বালানি মূল্য কমলেও সামগ্রিক জীবনযাত্রার ব্যয় সাধারণ মানুষের জন্য বড় চাপই ছিল।
ঈদযাত্রায় শৃঙ্খলা: প্রশংসার একটি জায়গা
ইউনূস সরকারের সময় ঈদযাত্রা ব্যবস্থাপনা নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছিল। বিশেষ করে ২০২৫ সালের ঈদযাত্রায় বাংলাদেশ রেলওয়ের ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশংসা দেখা যায়। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন পরিবহন ব্যবস্থায় অতিরিক্ত যাত্রী চাপ থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে আগের তুলনায় ব্যবস্থাপনা ভালো হওয়ার কথা উঠে আসে।
তবে ‘কোথাও কোনো যানজট ছিল না’, ‘কোনো অতিরিক্ত ভিড় ছিল না’—এ ধরনের সর্বজনীন দাবি তথ্য দিয়ে নিশ্চিত করা যায় না। ২০২৫ সালের ঈদের পর ঢাকায় ফেরার সময় বিভিন্ন প্রবেশপথ ও টার্মিনালে বড় ধরনের যাত্রী ও যানবাহনের চাপের খবরও প্রকাশিত হয়েছিল।
তাই বলা যায়, কিছু ক্ষেত্রে ঈদযাত্রা ব্যবস্থাপনায় উন্নতি দেখা গেলেও পুরো দেশকে যানজটমুক্ত বা ভিড়মুক্ত বলা অতিরঞ্জিত হবে।
বাকস্বাধীনতা ও রাজনৈতিক পরিসর কতটা উন্মুক্ত হয়েছিল?
ইউনূস সরকারের অন্যতম বড় দাবি ছিল নাগরিক ও রাজনৈতিক পরিসর উন্মুক্ত করা। Freedom House-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগের সরকারের তুলনায় রাজনৈতিক ও নাগরিক পরিসরে কিছুটা উন্মুক্ততা তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে অনলাইন ও রাজনৈতিক মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে পরিবেশের উন্নতির কথাও উল্লেখ করা হয়।
তবে এখানেও বিতর্ক রয়েছে।
Human Rights Watch ২০২৫ সালে অভিযোগ করে যে, অন্তর্বর্তী সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় আওয়ামী লীগ-সমর্থকদের গ্রেপ্তারে কঠোর অবস্থান নিয়েছিল। একই সংস্থা মতপ্রকাশ ও সংগঠনের স্বাধীনতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
অতএব, ‘পূর্ণ বাকস্বাধীনতা’—এটি একটি রাজনৈতিক মূল্যায়ন; এটিকে অবিতর্কিত বাস্তবতা হিসেবে বলা যাবে না। তবে আগের সময়ের তুলনায় মতপ্রকাশের ক্ষেত্র কিছুটা প্রসারিত হয়েছিল—এমন আন্তর্জাতিক মূল্যায়ন রয়েছে।
ভারত ও আন্তর্জাতিক চাপ মোকাবিলা
ইউনূস সরকারের সময় বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও টানাপোড়েন তৈরি হয়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান, তাঁকে ফেরত পাঠানোর দাবি, সীমান্ত, বাণিজ্য ও বিভিন্ন কূটনৈতিক ইস্যুতে দুই দেশের সম্পর্ক জটিল হয়ে ওঠে।
একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য ও কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনর্বিন্যাসের চেষ্টা চালানো হয়। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য শুল্কের চাপ মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকার ওয়াশিংটনের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনায় সক্রিয় ছিল।
তবে ‘ভারতের সব কৌশলগত নিষেধাজ্ঞা প্রতিহত করা হয়েছে’—এমন নির্দিষ্ট ও সর্বজনস্বীকৃত তথ্য পাওয়া যায় না। তাই বিষয়টি রাজনৈতিক মূল্যায়নের পর্যায়েই রাখা যুক্তিযুক্ত।
চট্টগ্রাম বন্দর ও ‘দেশ বিক্রি’ অভিযোগ
ইউনূস সরকারের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘দেশ বিক্রি’, ‘সেন্টমার্টিন বিক্রি’ কিংবা ‘চট্টগ্রাম বন্দর বিক্রি’—এ ধরনের নানা অভিযোগ প্রচারিত হয়েছে।
কিন্তু কোনো দেশের সার্বভৌম ভূখণ্ড বা সেন্টমার্টিন দ্বীপ ‘বিক্রি’ করে দেওয়া হয়েছে—এমন দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায় না। একইভাবে চট্টগ্রাম বন্দরের কোনো অংশের ব্যবস্থাপনা বা বেসরকারি অংশগ্রহণকে সরাসরি ‘বন্দর বিক্রি’ বলা এবং সম্পত্তি হস্তান্তরকে একই বিষয় হিসেবে দেখাও সঠিক নয়।
চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন কার্যক্রম ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে পরিবর্তন, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বেসরকারি অংশগ্রহণ নিয়ে আলোচনা হয়েছে; কিন্তু এসবকে ‘দেশ বিক্রি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার মতো নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই।
আইনশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক অস্থিরতা ছিল বড় দুর্বলতা
ইউনূস সরকারের সবচেয়ে বড় সমালোচনাগুলোর একটি ছিল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক অস্থিরতা।
Human Rights Watch-এর ২০২৬ সালের বাংলাদেশ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকার আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং মানবাধিকার সংস্কারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিল। নির্বিচার আটক, গণগ্রেপ্তার এবং রাজনৈতিক প্রতিশোধের অভিযোগও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
এ কারণে শুধু অর্থনীতি বা স্বাধীনতার আলোকে ইউনূস সরকারের মূল্যায়ন করলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। আইনশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
তাহলে ১৮ মাসের ইউনূস সরকারকে কীভাবে দেখা উচিত?
একটি বিষয় স্পষ্ট—ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ১৮ মাসের সরকারকে শুধু ‘সফল’ কিংবা ‘ব্যর্থ’—এই দুই শব্দে মূল্যায়ন করা কঠিন।
একদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পুনর্গঠন, রাজনৈতিক পরিসর কিছুটা উন্মুক্ত করা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কারের উদ্যোগ এবং নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয়গুলো ইতিবাচক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি, দ্রব্যমূল্যের চাপ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, রাজনৈতিক প্রতিশোধের অভিযোগ এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের ধারাবাহিক আন্দোলন তাঁর সরকারের সীমাবদ্ধতাগুলোও স্পষ্ট করেছে।
শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ইউনূস সরকার ক্ষমতা আঁকড়ে রাখেনি। ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর নতুন নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত হয়।
ব্যক্তিগত মূল্যায়নের জায়গাটি কোথায়?
অনেক নাগরিকের কাছে রাজনীতির বাইরে থেকে একজন ব্যক্তির রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা ছিল একটি বিরল ঘটনা। কেউ তাঁর অর্থনৈতিক সংস্কারকে গুরুত্ব দেবেন, কেউ রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিস্তৃতিকে, কেউ আবার রিজার্ভ বৃদ্ধিকে। আবার কেউ আইনশৃঙ্খলা ও দ্রব্যমূল্যের ব্যর্থতাকে বেশি গুরুত্ব দেবেন।
তাই ড. ইউনূসকে নিয়ে মতভেদ থাকাটাই স্বাভাবিক।
একজন নাগরিকের ব্যক্তিগত স্মৃতিতে তাঁর ১৮ মাস হয়তো অন্যভাবে থেকে যেতে পারে—বিশেষ করে মতপ্রকাশের সুযোগ, রাজনৈতিক পরিবেশের পরিবর্তন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার কিছু সূচক কিংবা ঈদযাত্রার ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়গুলোর কারণে।
তবে ইতিহাসের বিচারে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের পাশাপাশি তথ্য, পরিসংখ্যান, নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং বাস্তব ফলাফল—সবকিছুকেই একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ১৮ মাস তাই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন একটি অধ্যায়, যার মূল্যায়ন এখনো শেষ হয়নি। সময়ের সঙ্গে তাঁর সরকারের ভালো-মন্দ উভয় দিকই আরও পরিষ্কারভাবে ইতিহাসের পাতায় স্থান পাবে।


