এইমাত্র পাওয়া

সারাদেশে ২ হাজার মিনি কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণ করবে সরকার, সুবিধা পাবেন ৪০ হাজার কৃষক

কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের সংরক্ষণ সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে আগামী এক থেকে দুই বছরের মধ্যে দেশের বিভিন্ন এলাকায় দুই হাজার মিনি কোল্ড স্টোরেজ স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। কৃষিপণ্যের অপচয় কমানো, বাজারে সরবরাহ ব্যবস্থার ভারসাম্য রক্ষা এবং কৃষকের আয় বৃদ্ধির লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

সোমবার রাজধানীর একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত ‘রিপারপোজিং অ্যাগ্রিকালচারাল পাবলিক স্পেন্ডিং ফর কোয়ালিটি গ্রোথ অ্যান্ড জবস ইন বাংলাদেশ’স এগ্রিফুড সিস্টেম’ শীর্ষক নীতিনির্ধারণী সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ তথ্য জানান কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ।

কৃষিমন্ত্রী বলেন, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে কৃষি খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত। ফলে জাতীয় অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে হলে কৃষি খাতের উন্নয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকার বাস্তবমুখী বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।

তিনি বলেন, কৃষকরা কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে ফসল উৎপাদন করলেও সংরক্ষণ সুবিধার অভাবে অনেক সময় ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হন। বিশেষ করে সবজি, ফলমূল ও অন্যান্য পচনশীল কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে মৌসুমে অতিরিক্ত উৎপাদনের কারণে বাজারদর কমে যায়। ফলে কৃষককে বাধ্য হয়ে কম দামে পণ্য বিক্রি করতে হয়।

এই সমস্যা সমাধানে কৃষকদের দোরগোড়ায় আধুনিক সংরক্ষণ সুবিধা পৌঁছে দিতে মিনি কোল্ড স্টোরেজ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

সমবায়ভিত্তিক ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হবে কোল্ড স্টোরেজ

কৃষিমন্ত্রী জানান, প্রতিটি মিনি কোল্ড স্টোরেজ ১৫ থেকে ২০ জন কৃষকের সমন্বয়ে গঠিত সমবায়ভিত্তিক ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হবে। এসব সংরক্ষণাগার সৌরবিদ্যুৎচালিত হওয়ায় বিদ্যুৎ খরচ কমবে এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত হবে।

তিনি বলেন, সরকার ইতোমধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে কয়েকটি এলাকায় এই মডেল বাস্তবায়ন করেছে এবং সেখানে ইতিবাচক ফলাফল পাওয়া গেছে। পাইলট প্রকল্পের সফলতার ভিত্তিতেই সারাদেশে এ উদ্যোগ সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

মন্ত্রী আরও জানান, পরিকল্পনা অনুযায়ী ২ হাজার মিনি কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন করা সম্ভব হলে প্রায় ৪০ হাজার কৃষক সরাসরি এর সুবিধা পাবেন। এর ফলে কৃষিপণ্যের অপচয় কমবে, কৃষকরা সুবিধাজনক সময়ে পণ্য বাজারজাত করতে পারবেন এবং বাজারে মূল্য ওঠানামাও কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসবে।

কৃষি উৎপাদনে ডাটাবেসভিত্তিক পরিকল্পনা

কৃষিপণ্যের উৎপাদন ও বাজার চাহিদার মধ্যে সমন্বয় গড়ে তুলতে সরকার ডাটাবেসভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ করছে বলেও জানান কৃষিমন্ত্রী।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, কোন অঞ্চলে কী পরিমাণ কৃষিপণ্যের চাহিদা রয়েছে এবং কোথায় কী পরিমাণ উৎপাদন হচ্ছে—এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হবে। এর ফলে কৃষকরা চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন করতে পারবেন এবং অতিরিক্ত উৎপাদনের কারণে বাজার ধসের ঝুঁকি কমবে।

তিনি বলেন, এ ধরনের তথ্যনির্ভর কৃষি ব্যবস্থাপনা চালু হলে ভোক্তারাও সারা বছর তুলনামূলক স্থিতিশীল দামে কৃষিপণ্য কিনতে পারবেন।

পেঁয়াজ ও আদায় স্বয়ংসম্পূর্ণতার লক্ষ্যে কাজ

সভায় কৃষিমন্ত্রী আরও জানান, সরকার পেঁয়াজ, পেঁয়াজবীজ এবং আদা উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের জন্য ব্যাপক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।

তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, আগামী এক থেকে দেড় বছরের মধ্যেই দেশে পেঁয়াজ আমদানির প্রয়োজনীয়তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে বা সম্পূর্ণ বন্ধ করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে আগামী তিন বছরের মধ্যে পেঁয়াজবীজ ও আদা উৎপাদনেও দেশ স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে পারবে।

বিশ্বব্যাংকের অংশগ্রহণ

অনুষ্ঠানে সূচনা বক্তব্য দেন বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটান অঞ্চলের ডিভিশন ডিরেক্টর জ্যঁ পেম।

এ সময় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশ্বব্যাংকের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ড. মানসুর আহমেদ এবং গবেষণা বিশ্লেষক জোনায়েদ সহল। সভায় বিশ্বব্যাংকের আঞ্চলিক প্রতিনিধি ড. ডিনা উমালি ডেইনিঙ্গারসহ নীতিনির্ধারক, গবেষক, শিক্ষার্থী এবং কৃষি খাতের বিভিন্ন অংশীজন উপস্থিত ছিলেন।

কৃষি খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার

বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রামীণ পর্যায়ে আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা গেলে কৃষিপণ্যের অপচয় উল্লেখযোগ্য হারে কমবে এবং কৃষকরা বাজারের অনুকূল সময়ে পণ্য বিক্রি করে বেশি লাভবান হতে পারবেন। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎচালিত মিনি কোল্ড স্টোরেজ প্রকল্প কৃষি খাতে প্রযুক্তিনির্ভর ও টেকসই উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *