এইমাত্র পাওয়া

আইএমএফের ঋণ পেতে সরকার এতটা আগ্রহী কেন? অর্থনীতি বাঁচাতে নাকি সংস্কারের চাপ?

বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে ঋণ পাওয়ার জন্য ধারাবাহিকভাবে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি বিদ্যমান কর্মসূচির পরিবর্তে নতুন ঋণ চুক্তির জন্যও সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করেছে। প্রশ্ন উঠেছে—আইএমএফের কঠোর শর্ত থাকা সত্ত্বেও সরকার কেন এই ঋণ পেতে এতটা আগ্রহী? অর্থনীতিবিদদের মতে, এর পেছনে রয়েছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট, বাজেট ঘাটতি, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজারে আস্থার বিষয়।

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ

গত কয়েক বছরে ডলার সংকট, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের কারণে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। আইএমএফের ঋণ সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতে সহায়তা করে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার প্রতি আস্থা বাড়ায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, আইএমএফের সহায়তা পাওয়া গেলে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকেও অর্থায়ন সহজ হয়।

বাজেট ঘাটতি ও রাজস্ব সংকট

বাংলাদেশের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো কম কর-জিডিপি অনুপাত। সরকার উন্নয়ন ব্যয় ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চালিয়ে যেতে অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন অনুভব করছে। আইএমএফ দীর্ঘদিন ধরে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, কর অব্যাহতি কমানো এবং কর প্রশাসনে সংস্কারের ওপর জোর দিয়ে আসছে। সরকার এসব সংস্কার বাস্তবায়নের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে রাজস্ব আয় বাড়ানোর সুযোগও দেখছে।

কেন কঠিন শর্ত দিচ্ছে আইএমএফ?

আইএমএফের মূল লক্ষ্য শুধু ঋণ দেওয়া নয়, বরং ঋণগ্রহীতা দেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা। এজন্য বাংলাদেশকে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার বাস্তবায়নের শর্ত দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—

  • ডলারের বিনিময় হার আরও বাজারভিত্তিক করা।
  • জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি কমানো।
  • কর আদায় বৃদ্ধি করা।
  • ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।
  • রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের তথ্য প্রকাশ করা।
  • আর্থিক খাতের তদারকি জোরদার করা।

সাধারণ মানুষের উদ্বেগ কোথায়?

আইএমএফের অনেক শর্ত বাস্তবায়িত হলে জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও বিভিন্ন সেবার মূল্য বৃদ্ধি পেতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। বাজারভিত্তিক ডলার বিনিময় হার চালু হলে আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে, যা মূল্যস্ফীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণেই আইএমএফের শর্ত নিয়ে দেশে বিভিন্ন মহলে আলোচনা ও সমালোচনা দেখা যায়।

সরকার কেন ঝুঁকি নিয়েও এগোচ্ছে?

অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকার মনে করছে যে স্বল্পমেয়াদে কিছু কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হলেও দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী করা জরুরি। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, কর আদায় বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনের জন্য আইএমএফ কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে ঋণযোগ্যতা বজায় রাখতেও আইএমএফের সমর্থন একটি ইতিবাচক বার্তা হিসেবে কাজ করে।

উপসংহার

আইএমএফের ঋণ নিয়ে সরকারের আগ্রহের মূল কারণ শুধু অর্থ পাওয়া নয়; বরং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সুরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক আস্থা ধরে রাখা। তবে এর বিনিময়ে যেসব সংস্কার বাস্তবায়ন করতে হবে, সেগুলোর প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর পড়তে পারে। তাই সরকারকে একদিকে অর্থনৈতিক সংস্কার এগিয়ে নিতে হবে, অন্যদিকে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর স্বার্থ সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপও নিশ্চিত করতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *