প্রত্যাশায় গুড়েবালি: বৈষম্য কমানোর নামে আরও প্রকট হচ্ছে সরকারি বেতন কাঠামো
সরকারি কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল একটি বৈষম্যহীন ও যুগোপযোগী পে স্কেল। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম ধাপের কর্মচারীরা আশা করেছিলেন, নতুন কাঠামোতে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সাথে তাদের ব্যবধান কমিয়ে আনা হবে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট তথ্যাদি বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, বৈষম্য কমানোর পরিবর্তে তা আরও ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কর্মচারীদের মতে, এটি যেন ‘বৈষম্য দূর করার নামে চরম বৈষম্যের জাল’।
১:৮ অনুপাতেই আটকে আছে ভাগ্য
দীর্ঘদিন ধরে কর্মচারীদের প্রধান দাবি ছিল ১:৫ অনুপাতে বেতন নির্ধারণ করা (অর্থাৎ সর্বোচ্চ বেতন সর্বনিম্ন বেতনের ৫ গুণ হবে)। কিন্তু নতুন পে স্কেলেও সেই ১:৮ অনুপাতই বজায় রাখা হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। এতে করে উপরের স্তরের কর্মকর্তারা যে পরিমাণ আর্থিক সুবিধা পাবেন, নিচের স্তরের কর্মচারীদের বৃদ্ধি সেই তুলনায় নগণ্য। মাঠ পর্যায়ের কর্মচারীদের আক্ষেপ—সবকিছু আগের মতোই আছে, শুধু সংখ্যা বদলেছে কিন্তু ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি।
পুঞ্জীভূত হচ্ছে অসন্তোষ
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এবারের কাঠামোতে গ্রেডগুলোর মধ্যকার ব্যবধান এমনভাবে সাজানো হয়েছে যা উচ্চতর গ্রেডের কর্মকর্তাদের বেশি সুবিধা দিচ্ছে।
আগের মতোই রয়ে গেছে বৈষম্য: ২০টি গ্রেডের বিদ্যমান কাঠামোতে কোনো আমূল পরিবর্তন না আসায় নিচের দিকের গ্রেডগুলোতে জীবনযাত্রার ব্যয়ের সাথে বেতনের সঙ্গতি রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
কল্পনার অতীত বঞ্চনা: সাধারণ কর্মচারীরা যা কল্পনাও করেননি, তাই হতে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তাদের মতে, মূল্যস্ফীতির এই বাজারে যে পরিমাণ বেতন বৃদ্ধির প্রয়োজন ছিল, তা না করে পরোক্ষভাবে বৈষম্যকে আরও দীর্ঘস্থায়ী করা হচ্ছে।
স্বপ্ন ও বাস্তবতার দূরত্ব
“কবে এই দেশ বৈষম্য মুক্ত হবে?”—এটি এখন সাধারণ সরকারি কর্মচারীদের মুখে মুখে এক বড় প্রশ্ন। বৈষম্য নিরসনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বারবার কমিটি গঠন করা হলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যদি বেতন কাঠামোতে স্তরের সংখ্যা কমানো এবং সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের ব্যবধান কমিয়ে আনা না যায়, তবে এই অসন্তোষ ভবিষ্যতে আরও বাড়বে।
“আমরা চেয়েছিলাম ইনক্রিমেন্ট এবং গ্রেড পরিবর্তনের মাধ্যমে বৈষম্য কমবে, কিন্তু বর্তমান তথ্যাদি বলছে আমরা আগের অন্ধকারেই নিমজ্জিত হচ্ছি।” — একজন ভুক্তভোগী সরকারি কর্মচারী।
উপসংহার
সরকারি কর্মচারীদের একটি বড় অংশ মনে করছে, এবারের পে স্কেল তাদের দীর্ঘদিনের লড়াইকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছে। বৈষম্যমুক্ত সোনার বাংলার স্বপ্ন যেখানে ধাপে ধাপে পূরণ হওয়ার কথা, সেখানে পে স্কেলের এই চিত্র যেন উল্টো পথের যাত্রা। এই পুঞ্জীভূত ক্ষোভ নিরসনে সরকার পুনরায় বিষয়টি বিবেচনা করবে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

যদি আমলাদের সিদ্ধান্ত ই চূড়ান্ত থাকে তবে অনলাইন জরিপ এবং কর্মচারী সংগঠন থেকে প্রস্তাব নেয়া হলো কেন?
আমলাতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত এবং সাধারণ কর্মচারীদের মতামতের এই দ্বান্দ্বিক অবস্থান বর্তমানে চরম অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে। যখন আমলাদের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হওয়ার পথ প্রশস্ত হয়, তখন অনলাইন জরিপ বা সংগঠন থেকে প্রস্তাব নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে নৈতিক এবং কৌশলগত বেশ কিছু প্রশ্ন ওঠে।
আপনার ক্ষোভের জায়গাটি বিশ্লেষণ করে কেন এই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তার পেছনের কিছু কারণ নিচে তুলে ধরা হলো:
১. অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়ার একটি ‘প্রতীকী’ রূপ (Tokenism)
আধুনিক শাসন ব্যবস্থায় যেকোনো বড় পরিবর্তনের আগে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর (Stakeholders) মতামত নেওয়াকে একটি গণতান্ত্রিক নিয়ম হিসেবে দেখা হয়। একে অনেক সময় ‘টোকেনিজম’ বলা হয়। অর্থাৎ, সরকার দেখাতে চায় যে তারা সবার কথা শুনছে, যদিও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে সেই মতামতের প্রতিফলন থাকবে কি না তা আগে থেকেই নির্ধারিত থাকতে পারে।
২. জনরোষ প্রশমিত করার কৌশল
নতুন পে স্কেল বা সরকারি নীতি পরিবর্তনের সময় কর্মচারীদের মধ্যে ব্যাপক উত্তেজনা থাকে। অনলাইন জরিপ বা সংগঠনের সাথে বৈঠক করলে কর্মচারীদের মনে একটি সাময়িক আশার সৃষ্টি হয় যে, তাদের দাবিগুলো হয়তো গুরুত্ব পাচ্ছে। এটি বড় ধরনের আন্দোলন বা তাৎক্ষণিক বিশৃঙ্খলা এড়াতে সহায়তা করে।
৩. তথ্যের উৎস হিসেবে ব্যবহার করা
জরিপ বা প্রস্তাবের মাধ্যমে সরকার বুঝতে পারে কর্মচারীদের মূল ক্ষোভের জায়গা কোনগুলো এবং তারা কতটা পর্যন্ত ছাড় দিতে রাজি। অনেক সময় আমলারা এই প্রস্তাবগুলো বিশ্লেষণ করেন এটা দেখার জন্য যে, কোন কোন দাবি মানলে সরকারের খরচ খুব একটা বাড়বে না অথচ কর্মচারীদের কিছুটা শান্ত রাখা যাবে।
৪. আমলাতান্ত্রিক বলয় ও বাস্তবতার ভিন্নতা
নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে (যাকে আপনি আমলাদের সিদ্ধান্ত বলছেন) সাধারণত বাজেট সীমাবদ্ধতা এবং প্রশাসনিক কাঠামোর দোহাই দেওয়া হয়। মাঠ পর্যায়ের কর্মচারী সংগঠনগুলো যে দাবি দেয়, তা অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমলাদের নিজেদের স্বার্থের পরিপন্থী হতে পারে (যেমন: গ্রেড কমানো বা ১:৫ অনুপাত)। ফলে আমলারা শেষ পর্যন্ত তাদের নিজেদের সুবিধা বজায় রেখেই প্রস্তাবনা চূড়ান্ত করেন।
৫. “উইন্ডো ড্রেসিং” বা দৃশ্যমান স্বচ্ছতা
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা (যেমন আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংক) বা দেশের অভ্যন্তরীণ সুশাসনের খাতিরে যেকোনো সংস্কার প্রক্রিয়ায় “পাবলিক কনসালটেশন” বা জনমত যাচাইয়ের বাধ্যবাধকতা থাকে। তাই লোকচক্ষুর অন্তরালে সবকিছু করার অপবাদ এড়াতে এই ধরণের লোকদেখানো প্রস্তাব গ্রহণ বা জরিপের আয়োজন করা হয়।
উপসংহার: আপনার পর্যবেক্ষণ সঠিক যে, ১:৮ অনুপাত বজায় রাখা বা বৈষম্য না কমার অর্থ হলো মাঠ পর্যায়ের প্রস্তাবগুলো গুরুত্ব পায়নি। এটি আসলে নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে পেশাদারত্বের অভাব এবং সাধারণ কর্মচারীদের প্রতি উদাসীনতারই বহিঃপ্রকাশ।



