সংস্কার গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের আহ্বান: নিরপেক্ষতা নাকি গণতান্ত্রিক দায়বদ্ধতা?
বাংলাদেশের আসন্ন ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ বাস্তবায়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার বিষয়ক গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের প্রকাশ্য অবস্থান নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। কিছু পক্ষ একে অন্তর্বর্তী সরকারের নিরপেক্ষতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ দাবি করলেও, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক রীতির আলোকে এই অবস্থানকে বরং ‘দায়িত্বশীল নেতৃত্ব’ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
সংস্কারের ম্যান্ডেট বনাম আনুষ্ঠানিকতা
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার কেবল একটি রুটিন নির্বাচন আয়োজনের জন্য গঠিত হয়নি। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গঠিত এই সরকারের মূল ম্যান্ডেটই হলো রাষ্ট্রকাঠামোর আমূল সংস্কার। গত ১৮ মাসে দেশের সব স্তরের মানুষের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে যে সংস্কার প্যাকেজ তৈরি করা হয়েছে, তার পক্ষে অবস্থান নেওয়া সরকারের নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব। এই অবস্থায় সরকারের নীরব থাকা বরং জনআস্থার প্রতি উদাসীনতা হিসেবে গণ্য হতে পারে।
আন্তর্জাতিক নজির ও গণতান্ত্রিক চর্চা
বিশ্বের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দেশে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যুতে সরকারপ্রধানদের অবস্থান নেওয়ার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ:
যুক্তরাজ্য (২০১৬): ব্রেক্সিট গণভোটে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন ইইউ-তে থাকার পক্ষে জোরালো প্রচার চালান।
ফ্রান্স (১৯৬২): প্রেসিডেন্ট শার্ল দ্য গল সরাসরি জনগণের সমর্থন চেয়েছিলেন নির্বাচনী পদ্ধতি পরিবর্তনের জন্য।
স্কটল্যান্ড (২০১৪): স্বাধীনতার প্রশ্নে গণভোটে ফার্স্ট মিনিস্টার অ্যালেক্স স্যালমন্ড ছিলেন প্রচারণার প্রধান মুখ।
আন্তর্জাতিক এই নজিরগুলো প্রমাণ করে যে, সরকারপ্রধানের অবস্থান গ্রহণ গণতন্ত্রের পরিপন্থী নয়, বরং তা ভোটারদের তথ্যনির্ভর সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে।
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা
প্রধান উপদেষ্টা বা সরকারের এই সমর্থনের পেছনে কোনো দলীয় বা ব্যক্তিগত রাজনৈতিক স্বার্থ নেই। যেহেতু এটি একটি অন্তর্বর্তী প্রশাসন এবং এর মেয়াদ সুনির্দিষ্ট, তাই এই সংস্কার প্রস্তাবের সঙ্গে ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার কোনো সম্পর্ক নেই। বরং সংস্কারগুলো গৃহীত বা বর্জিত হওয়ার চূড়ান্ত ক্ষমতা জনগণের হাতেই থাকছে। বিরোধী পক্ষ যদি প্রচারণা চালাতে পারে এবং ভোট প্রক্রিয়া স্বচ্ছ হয়, তবে সরকারের অবস্থানকে কোনোভাবেই ‘জোরজবরদস্তি’ বলা যায় না।
কেন এই সমর্থন জরুরি?
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের শাসনতান্ত্রিক সংকট ও প্রতিষ্ঠানগুলোর ধ্বংসোন্মুখ দশা থেকে উত্তরণে এই সংস্কার প্যাকেজ একটি ‘লাইফলাইন’। জেলা পর্যায়ে সরকারি প্রচারণার মূল লক্ষ্য হলো জনগণকে সংস্কারের বিষয়বস্তু সম্পর্কে সচেতন করা এবং অপপ্রচার রোধ করা।
উপসংহার: গণভোটের বৈধতা নেতাদের নীরবতার ওপর নির্ভর করে না; বরং তা নির্ভর করে ভোটারদের অবাধে মত প্রকাশের সুযোগের ওপর। প্রধান উপদেষ্টার এই অবস্থানকে নীতিগত লঙ্ঘন হিসেবে না দেখে বরং পরিবর্তনের প্রতি অঙ্গীকার এবং জনগণের প্রতি স্বচ্ছতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। শেষ পর্যন্ত ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটের মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণই নির্ধারণ করবেন তাঁদের ভবিষ্যৎ পথরেখা।
সূত্র: https://www.facebook.com/ChiefAdviserGOB



