মায়ের ডায়ালাইসিসের খরচ জোগানো ছেলে কেন কারাগারে?

রাজধানী ঢাকা শহরে বাসে চড়তে গিয়ে একটি দৃশ্য সবারই পরিচিত। কিডনি ডায়ালাইসিসের খরচের জন্য কেউ না কেউ সাহায্য চাইছেন। রোগী নিজেই বা রোগীর ছেলে বা মেয়ে বাসে উঠে কাকুতিমিনতি করে যাত্রীদের কাছে অর্থ সাহায্য চান।

একই দৃশ্য আপনি দেখবেন ঢাকার অধিকাংশ মসজিদের সামনেও। নামাজ শেষে যখন মুসল্লিরা বের হয়ে যান, তখন গেটের সামনে কেউ না কেউ দাঁড়িয়ে থাকেন। উদ্দেশ্য একই, নিজের বা পরিবারের কারও কিডনি ডায়ালাইসিসের খরচ জোগাড় করা।

যদিও এমন দৃশ্যের সঙ্গে পরিচিত হতে আমাকে ঢাকায় আসতে হয়নি। বেড়ে ওঠার শহর চট্টগ্রামেই রাস্তায়, বাসে বা মসজিদের সামনে অহরহ দেখা যায়। তার মানে এ নয়, যারা মানুষের কাছে হাত পাতছেন, তাঁরা সবাই গরিব বা দরিদ্র। কিন্তু নিজের বা পরিবারের কারও কিডনি রোগ তাঁদের অনেককে পথেই নামিয়ে এনেছে। যাঁরা কিডনি রোগীর সঙ্গে পরিচিত নন বা কারও পরিবার বা আত্মীয়স্বজন এ ধরনের পরিস্থিতিতে পড়েননি, তাঁরা কোনোভাবেই সেই কাকুতিমিনতি বা অসহায় পরিস্থিতি বোঝার কথা নয়।

আসুন, এবার একজন কিডনি রোগীর সঙ্গে পরিচত হই। ২৭ বছরের যুবক মো. আসাদুল হক। চট্টগ্রাম শহরের বন্দরটিলা এলাকার এ বাসিন্দা একটা সময় ক্রেন চালাতেন। মাকে নিয়ে সচ্ছল সংসার ছিল। কিন্তু একসময় দুটি কিডনিই বিকল হয়ে যায় আসাদুলের। এরপর থেকে আর কিছুই করতে পারেন না। মাসে ডায়ালাইসিস করাতে হয় ১২ বার। সরকারি ভর্তুকি মূল্যে প্রতি মাসে তাঁর ডায়ালাইসিসের খরচ পড়ে সাড়ে ছয় হাজার টাকা। ভাবুন তো, এই দূর্মল্যের দিনে কর্মক্ষমতা হারানো একটা মানুষের শুধু ডায়ালাইসিসের পেছনেই মাসে এত টাকা খরচ! সংসার খরচ, মায়ের চিকিৎসাসহ অন্যান্য খরচ কোত্থেকে আসবে?

দিন শেষে আসাদুলকে বসতে হয় মসজিদের সামনে। হাত পাততে হয় মুসল্লিদের কাছে। সরকার ভর্তুকি কমিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে সেই খরচ মাসে গিয়ে ঠেকে ২০ হাজার টাকা। এটি কি ভাবা যায়?

সামর্থ্যহীন, দরিদ্র, অসহায় কিডনি রোগীর জন্য তো রীতিমতো আত্মহত্যার শামিল!
মানুষের বেঁচে থাকার যে মৌলিক পাঁচটি চাহিদা আমাদের সংবিধানস্বীকৃত, স্বাস্থ্যসেবা তার অন্যতম। অথচ সম্প্রতি প্রকাশিত পাওয়া সরকারি প্রতিবেদনেই আমরা দেখছি, স্বাস্থ্য খাতে সরকারের ব্যয়ের অংশ বছর বছর কমছে। বিপরীতে চিকিৎসা করাতে গিয়ে দেশের মানুষের ওপর আর্থিক বাড়ছে। বর্তমানে স্বাস্থ্য ব্যয়ের তিন-চতুর্থাংশ বহন করতে হচ্ছে ব্যক্তি নিজেকেই। ডায়ালাইসিসের ভর্তুকি কমানোর সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়েই সেটি যেন আরও বেশি প্রতীয়মান হয়।

মুস্তাকিম কী বড় কোনো অপরাধী যে, তাঁকে আটকে রাখতে হবে? রাজনৈতিক কর্মসূচি দমন করতে বিরোধী দলের কোনো নেতা–কর্মীর মতো তাঁর প্রতিও তেমন আচরণ করল না পুলিশ? অথচ মায়ের ডায়ালাইসিসের ফি বৃদ্ধির প্রতিবাদ গিয়ে কেন তাঁকে এভাবে নিপীড়নের শিকার হতে হলো। কেন তাঁর জামিন হবে না? এমন হলে এ দেশের আদালত ও বিচারব্যবস্থার ওপর কীভাবে সাধারণ মানুষ আস্থা রাখবে?
দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ায় গত মঙ্গলবার চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনের সড়ক অবরোধ করেন রোগী ও স্বজনেরা। সংখ্যায় তাঁরা দুই শ জনের মতো ছিলেন। সেখানে ছিলেন একসময় সবজি বিক্রয়কারী, কেউ ছিলেন পোশাককর্মী, কেউ ছিলেন চানাচুর বিক্রেতা। আজকে সবাই কর্ম–অক্ষম। মানুষের কাছে হাত পেতে বা ভিক্ষা করে ডায়ালাইসিসের খরচ জোগাতে হয়। কিন্তু সেই মানুষগুলোর ওপর পুলিশ যা আচরণ করল, তাতে আমাদের হতবাক হতে হয়। বিরোধী দলের সভা–কর্মসূচি বাধা দেওয়ার ‘সরকারি দায়িত্ব’ পালন করতে করতে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া পুলিশ রীতিমতো রোগী ও তাঁদের স্বজনদের ওপর চড়াও হলো। পাঁচলাইশ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজিম উদ্দিন মজুমদারের নেতৃত্বে একদল পুলিশ মারধর করেছেন নিরুপায় হয়ে বিক্ষোভে নামা রোগী ও স্বজনদের।

এমন মারমুখী আচরণের পরেও ক্ষান্ত হয়নি পুলিশ। সেখানে পুলিশের দায়িত্ব পালনে বাধা ও পুলিশ সদস্যদের মারধরের অভিযোগে উল্টো রোগী ও তাঁদের স্বজনদের বিরুদ্ধে অজ্ঞাত পরিচয়ে ৫০ থেকে ৬০ জনকে আসামি করে মামলাও দিয়েছে। আসাদুলের সঙ্গে আরেক তরুণ মোহাম্মদ মোস্তাকিনও পুলিশের মারধরের শিকার হয়েছেন, তাঁকে গ্রেপ্তার করেও নিয়ে গেছে। মোস্তাকিন তাঁর কিডনি রোগী মা নাসরিন আক্তারকে নিয়ে প্রতিবাদে যোগ দিয়েছিলেন। সংবাদ চ্যানেলগুলোতে একটি ভিডিওতে দেখা যায়, পুলিশ নাসরিন আক্তারকে লাথি মেরেছেন। যদিও ওসি নাজিম উদ্দিনের ‘হাস্যকর’ বক্তব্য, অসাবধানতাবশত অন্য এক নারীর গায়ে পা লাগতে পারে। নাসরিন আক্তারের গায়ে লাগেনি।

৫৫ বছর বয়সী বিধবা নাসরিন আক্তার, সপ্তাহে তিন দিন ডায়ালাইসিস করে সাত বছর ধরে বেঁচে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। সম্বলহীন এই নারীর একমাত্র অবলম্বন মাদ্রাসাপড়ুয়া ২২ বছর বয়সী একমাত্র ছেলে মুস্তাকিম। আর এক মেয়ে প্রতিবন্ধী। মুস্তাকিমের টিউশনির টাকাতেই চলত মায়ের ডায়ালাইসিসের খরচ, বাসাভাড়া, সংসারের খরচ আর প্রতিবন্ধী বোনের দেখাশোনা। সেই মুস্তাকিম এখন কারাগারে।

ওসি মর্যাদার একজন পুলিশ কর্মকর্তা কিডনি রোগী এক নারীকে লাথি মেরে ফেলে দিলেন, তাঁর ছেলেকে মারধর করে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে গিয়ে থানায় ভরলেন, মামলা দিলেন, তাঁকেই কিনা আবার রিমান্ডে নেওয়ার সুযোগ চাইলেন! পুলিশের এমন অমানবিক ও নির্দয় আচরণের কী যৌক্তিকতা? যদিও গত বৃহস্পতিবার মুস্তাকিমকে রিমান্ডের আবেদন নামঞ্জুর করে কারাফটকে জিজ্ঞাসাবাদের আদেশ দিয়েছেন আদালত। কিন্তু আদালত মুস্তাকিমের জামিনের আবেদন নামঞ্জুর করেছেন।

প্রশ্ন হলো, মুস্তাকিম কী বড় কোনো অপরাধী যে, তাঁকে আটকে রাখতে হবে? রাজনৈতিক কর্মসূচি দমন করতে বিরোধী দলের কোনো নেতা–কর্মীর মতো তাঁর প্রতিও তেমন আচরণ করল না পুলিশ? অথচ মায়ের ডায়ালাইসিসের ফি বৃদ্ধির প্রতিবাদ গিয়ে কেন তাঁকে এভাবে নিপীড়নের শিকার হতে হলো। কেন তাঁর জামিন হবে না? এমন হলে এ দেশের আদালত ও বিচারব্যবস্থার ওপর কীভাবে সাধারণ মানুষ আস্থা রাখবে?

রোগী–স্বজনদের বিক্ষোভ ও তাঁদের ওপর পুলিশের হামলার ঘটনার পর চমেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নতুন অনেকগুলো ডায়ালাইসিস মেশিন বসানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এর ফলে কম মূল্যে ডায়ালাইসিস–সেবা পাবেন রোগীরা। কিন্তু বুকের মানিক ছেলেকে কারাগারে রেখে কী করে ঘুমাতে পারেন একজন মা! বর্তমানে এক আত্মীয়ের বাসায় আশ্রয়ে থাকা নাসরিন আক্তারের এখন দিন কাটছে ছেলের জন্য কান্না করতে করতে। ডায়ালাইসিস করাও বন্ধ হয়ে গেছে তাঁর। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘এই দুনিয়ায় ছেলে ছাড়া আমার আর কেউ নেই। আমার ছেলে অপরাধী হলে মেনে নিতাম। ডায়ালাইসিস ফি বৃদ্ধির প্রতিবাদ করতে গিয়ে ছেলেকে কারাগারে যেতে হলো। ছেলের মুক্তি না হলে আমাকেও কারাগারে নিয়ে যান।’

ছেলেকে ‘মিথ্যা মামলায়’ গ্রেপ্তার ও তাঁকে লাথি মারার অভিযোগে পাঁচলাইশ থানার ওসি নাজিম উদ্দিনের বিচার দাবি করেন কিডনি রোগী নাসরিন আক্তার। এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত চান তিনি। আমরা জানতে চাই, পুলিশের এ বাড়াবাড়ির বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হবে না? কেন মুস্তাকিমের জামিন হবে না? এতগুলো মানুষের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহার করা হোক। সাংবিধানিক অধিকারের দাবি নিয়ে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ করতে নামা কিছু অসহায় মানুষের বিরুদ্ধে এমন মামলা একটা রাষ্ট্রের জন্য লজ্জার।

রাফসান গালিব প্রথম আলোর সম্পাদকীয় সহকারী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *