নিয়োগ নিয়ে উপাচার্যরাও অনেক সময় বিব্রত হন

দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষক থেকে শুরু করে কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগে অনিয়ম-দুর্নীতি ও দলীয়করণের অভিযোগ আছে। দিন দিন এ অভিযোগ বাড়ছেই। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যদের বিরুদ্ধে নিয়ম ভঙ্গ করে অযোগ্য স্বজনদেরও নানা কৌশলে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এমন প্রেক্ষাপটে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর নিয়োগে ‘স্বতন্ত্র নিয়োগ কমিশন’ গঠনের সুপারিশ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। সুপারিশ করা নিয়োগ কমিশন কেন, এর কাঠামো ও কার্যক্রম কেমন হবে ইত্যাদি বিষয় নিয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন ইউজিসির বর্তমান সদস্য এবং খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য মুহাম্মদ আলমগীর। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিবেদক মোশতাক আহমেদ।

এবার ইউজিসি রাষ্ট্রপতির কাছে জমা দেওয়া বার্ষিক প্রতিবেদনে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগের স্বতন্ত্র নিয়োগ কমিশনের সুপারিশ করেছে, এর কারণ কী?

মুহাম্মদ আলমগীর: বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগে ‘স্বতন্ত্র নিয়োগ কমিশন’ করার বিষয়টি কেবল আমরাই অনুভব করছি, তা নয়, অনেক উপাচার্যও সেটি অনুভব করেন। অনেক উপাচার্য বলেছেন, তাঁরা নিয়োগ নিয়ে অনেক সময়ই বিব্রত হন। নিয়োগ নিয়ে অনেক বিষয় তাঁদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। তাঁরা নিয়োগে আরও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া চান। কিন্তু সেটি তাঁদের পক্ষে করা সম্ভবও হচ্ছে না। কারণ, এখানে নানা স্বার্থ আছে। গোষ্ঠী স্বার্থ, সামাজিক স্বার্থ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর থেকেও স্বার্থ আছে। আবার পারিবারিক চাপ, এলাকার চাপ ও রাজনৈতিক চাপও অনেক উপাচার্য উপেক্ষা করতে পারেন না। এ জন্য অনেক উপাচার্যও মনে করেন সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) যেভাবে নিয়োগ কার্যক্রম করে, সে রকম কিছু হলে এসব বিতর্ক এড়ানো সম্ভব। ইউজিসির সঙ্গে অনেক সময় অনির্ধারিত আলোচনায় অনেক উপাচার্য এসব কথা বলেছেন।

স্বতন্ত্র নিয়োগ কমিশনের সুপারিশের কারণ নিয়ে ধারণা পাওয়া গেল। কিন্তু এর কাঠামো কেমন হবে, সে বিষয়ে ইউজিসি কিছু কি ভেবেছে? যদি বিস্তারিত বলতেন।

মুহাম্মদ আলমগীর: কাঠামো নিয়ে এখনো সুনির্দিষ্টভাবে চিন্তাভাবনা করা হয়নি। কারণ, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগের বিষয়টি একটু ভিন্নরকমের। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আলাদাভাবে এটি করে। পদ ও আর্থিক সংস্থান থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেকোনো সময় এই নিয়োগ দিতে পারে। কিন্তু পিএসসিতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যে নিয়োগ কার্যক্রম হয়, তাতে অনেক সময় লেগে যায়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্রুত নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য এখনই কাঠামোটি নিয়ে সুনির্দিষ্টভাবে ভাবা হয়নি। এ ছাড়া কাঠামো করার আগে সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের দরকার আছে। কারণ, এখন আলাদা আলাদা আইনে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চলে। এ জন্য যাঁরা আইন করেন, তাঁদের নীতিগত সিদ্ধান্তের বিষয় আছে। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেও আস্থায় আনতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বোঝাতে সমর্থ না হলে এটি করা জটিল হবে। তাই কাঠামো করার আগে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পক্ষ থেকেও ইতিবাচক সম্মতি দরকার। তাহলেই কাঠামোর জায়গায় হাত দেওয়া যাবে।

ইউজিসি প্রতিবছরই বার্ষিক প্রতিবেদনে অনেক সুপারিশ করে থাকে। কিন্তু তার অধিকাংশই বাস্তবায়ন হয় না। এ বিষয়ে আপনার মতামত জানতে চাই?

মুহাম্মদ আলমগীর: অনেক সময়ই সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে বলা হয়, কিন্তু তাদের মতামত গুরুত্বসহকারে দেখার যে প্রবণতা, সেই সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। ইউজিসি সরকার দ্বারাই প্রতিষ্ঠিত। উচ্চশিক্ষাকে আরও মানসম্মত করা ও গণমুখী করার লক্ষ্যে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালে ইউজিসি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ইউজিসি অবশ্যই সরকারের নীতিনির্ধারণকেই প্রতিনিধিত্ব করে। সুতরাং ইউজিসির পরামর্শ শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে আন্তরিকভাবে গ্রহণ করতে হবে। ইউজিসির পরামর্শকে সরকারের নীতি হিসেবে দেখতে হবে। এভাবে দেখার প্রবণতা বা সংস্কৃতি যদি গড়ে না ওঠে, তাহলে আমরা যতই সুপারিশ করব, সেগুলো আলোর মুখ দেখা কঠিন হবে। হয়তো হবে, কিন্তু অনেক দীর্ঘসূত্রতায় পড়ে যাবে। তাই আস্থা থাকতে হবে। আস্থা থাকলে সুপারিশ আলোর মুখ দেখা সহজ হবে।

অধ্যাপক আলমগীর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *